মধ্যবর্তী নির্বাচনে জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, নেভাডা ও উইসকনসিনে কৃষ্ণাঙ্গ প্রার্থীদের জয়। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর, প্রথম নির্বাচিত কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নরসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বে নতুন মাইলফলক।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই সময়ে পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর এবং প্রথম নির্বাচিত কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর। এ ছাড়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে প্রথমবারের মতো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। শুধু কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী নয়, নারী, আদিবাসী ও হিস্পানিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও এবারের নির্বাচন নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জর্জিয়া থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। আটলান্টার সাবেক এই মেয়র যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন। তাঁর বিজয় দেশটির রাজনীতিতে নারীর পাশাপাশি কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই নির্বাচনে ফ্লোরিডা থেকে রিপাবলিকান প্রার্থী ও কংগ্রেস সদস্য বায়রন ডোনাল্ডস গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান গভর্নর। পাশাপাশি ফ্লোরিডার ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে অঙ্গরাজ্যজুড়ে কোনো নির্বাচনে জয়ী হওয়ার নজির গড়েছেন তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম স্টেটলাইনের বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর নির্বাচনের ক্ষেত্রে নতুন ইতিহাস তৈরি হয়েছে নেভাডা ও উইসকনসিনেও। নেভাডায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যারন ফোর্ড এবং উইসকনসিনে ডেভিড ক্রাউলি গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। উভয় অঙ্গরাজ্যেই এই প্রথম কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি গভর্নরের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।
জর্জিয়ার বটমস, ফ্লোরিডার ডোনাল্ডস, নেভাডার ফোর্ড এবং উইসকনসিনের ক্রাউলির সঙ্গে রয়েছেন মেরিল্যান্ডের বর্তমান গভর্নর ওয়েস মুর। কৃষ্ণাঙ্গ এই ডেমোক্র্যাট নেতা এবারের নির্বাচনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে নতুন মেয়াদে এই পাঁচজন দায়িত্ব নিলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই সময়ে পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর দায়িত্ব পালন করবেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করা একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ রিপাবলিকান ছিলেন পিনকনি বেন্টন স্টুয়ার্ট পিঞ্চব্যাক। তবে তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে গভর্নর হননি। ১৮৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুনর্গঠন যুগে লুইজিয়ানার গভর্নরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। সে বিবেচনায় বায়রন ডোনাল্ডসের বিজয় দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
এবারের নির্বাচনে কৃষ্ণাঙ্গ রাজনীতিকদের পাশাপাশি অন্যান্য জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। নিউ মেক্সিকোতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডেব হালান্ড গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন। লাগুনা পুয়েবলো জনগোষ্ঠীর সদস্য হালান্ডের বিজয় দেশটির আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তাঁর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিউ মেক্সিকো হবে দ্বিতীয় অঙ্গরাজ্য, যার গভর্নর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্য। এর আগে ওকলাহোমায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ওহাইওতেও নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও চিকিৎসক অ্যামি অ্যাকটন। তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক পর ওহাইওতে আবারও ডেমোক্র্যাটরা গভর্নরের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। ফলে নারী নেতৃত্বের পাশাপাশি অঙ্গরাজ্যটির রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলেও তাঁর জয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টেক্সাসে ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসা। তিনি অঙ্গরাজ্যটির প্রথম নারী লাতিনা গভর্নর হতে যাচ্ছেন। নির্বাচনে বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করেছেন তিনি। তাঁর এই জয়ের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তৃতীয় হিস্পানিক নারী গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
এর আগে নিউ মেক্সিকোতে দুজন হিস্পানিক নারী গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা হলেন বর্তমান ডেমোক্র্যাট গভর্নর মিশেল লুজান গ্রিশাম এবং সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর সুসানা মার্টিনেজ। ফলে জিনা হিনোজোসার বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হিস্পানিক নারীদের প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়াবে।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বুধবার বেলা ১১টার (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময়) হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ডেমোক্র্যাটরা ২২টিতে এবং রিপাবলিকানরা ১২টিতে জয় পেয়েছে। আলাস্কা ও কানসাসের ফল তখনো ঘোষণা করা হয়নি।
এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে গভর্নর ও অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনসভার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল রিপাবলিকানদের হাতে। এবারের নির্বাচনে সেই রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব শুধু দলীয় বিজয় বা পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিও নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ, নারী, আদিবাসী ও হিস্পানিক প্রার্থীদের সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বৈচিত্র্য বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একদিকে গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় সাফল্য, অন্যদিকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রার্থীদের ঐতিহাসিক বিজয় দেশটির রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একই সময়ে পাঁচজন কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের ঘটনা শুধু একটি নির্বাচনী অর্জন নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে।
পড়ুন:ট্রাম্পের পরাজয়ে ইরানিদের বাঁধভাঙা উল্লাস ও কটাক্ষ
ইমি/


