কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে নিজেদের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে এআই কোডিং স্টার্টআপ কন্ডাক্টর অধিগ্রহণ করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটা। কন্ডাক্টর এমন একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে একাধিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এজেন্টকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে সফটওয়্যার প্রকল্প তৈরি, পরিচালনা ও উন্নয়নের কাজ করা যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণের আর্থিক মূল্য কিংবা চুক্তির অন্যান্য শর্ত সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কন্ডাক্টর অধিগ্রহণের খবর প্রথম প্রকাশ করে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। পরে নিজেদের ব্লগে দেওয়া এক ঘোষণার মাধ্যমে অধিগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করে স্টার্টআপটি। এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও এআই এজেন্ট প্রযুক্তির বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায় মেটা।
কন্ডাক্টরের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) চার্লি হোল্টজ এক ঘোষণায় জানান, প্রতিষ্ঠানটি এখন থেকে মেটার অংশ হিসেবে কাজ করবে। বুধবার প্রকাশিত ঘোষণায় তিনি বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তারা আনন্দিত। আগামী বছরের শুরুতে গ্রাহকদের জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টেও মেটায় যুক্ত হওয়ার বিষয়ে নিজের আগ্রহের কথা জানান হোল্টজ। সেখানে তিনি মেটার এআই বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ওয়াং এবং সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাবসের পণ্য বিভাগের প্রধান নাট ফ্রিডম্যানের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে এআই প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন তিনি।
একাধিক এআই এজেন্টে সফটওয়্যার তৈরি
২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কন্ডাক্টর। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রধান পণ্য বাজারে আনে। প্রচলিত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট পদ্ধতির বাইরে গিয়ে একাধিক এআই এজেন্টকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর সুবিধা দেয় এই প্ল্যাটফর্ম।
সাধারণত একটি বড় সফটওয়্যার প্রকল্প তৈরি করতে বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে কোড লেখা, ত্রুটি শনাক্ত করা, নতুন ফিচার তৈরি, কোড পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন অংশের মধ্যে সমন্বয় সাধন। এসব কাজের জন্য প্রকৌশলীদের আলাদাভাবে সময় ও শ্রম দিতে হয়। কন্ডাক্টরের প্রযুক্তি এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী একটি প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে একাধিক এআই এজেন্টকে একই সময়ে দায়িত্ব দিতে পারেন। প্রতিটি এজেন্ট আলাদা কর্মপরিবেশে কাজ করে। ফলে একটি এজেন্ট যখন কোডের নির্দিষ্ট অংশ তৈরি করে, অন্য এজেন্ট তখন প্রকল্পের অন্য কোনো অংশে কাজ করতে পারে। এতে বড় সফটওয়্যার প্রকল্পের বিভিন্ন কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
এই পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো, সফটওয়্যার তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় একজন প্রকৌশলীকে প্রতিটি কাজ নিজ হাতে করতে হয় না। বরং তিনি এআই এজেন্টগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দেশনা দিতে পারেন এবং তাদের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। বিশেষ করে জটিল ও বড় আকারের সফটওয়্যার প্রকল্পে এ ধরনের প্রযুক্তি সময় সাশ্রয় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কন্ডাক্টরের এআই এজেন্টগুলো ক্লাউড, ব্যক্তিগত কম্পিউটার কিংবা ব্যবহারকারীর ফোনের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায়। তবে এসব এজেন্টের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল কন্ডাক্টরের নিজস্ব তৈরি নয়। বরং অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি এআই মডেল ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মটি পরিচালিত হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উন্নত এআই মডেলকে কাজে লাগিয়ে সফটওয়্যার তৈরির কাজ সহজ করাই কন্ডাক্টরের প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য।
ক্লাউড সেবা বন্ধের ঘোষণা
মেটার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর কন্ডাক্টরের বিদ্যমান সেবায় কিছু পরিবর্তন আসছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মটির মূল সুবিধাগুলো আগের মতোই চালু থাকবে। তবে কন্ডাক্টরের ক্লাউড সেবা আগামী ২০ নভেম্বর বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ক্লাউড সেবা বন্ধ হওয়ার পর ব্যবহারকারীদের ক্লাউডে সংরক্ষিত তথ্য মুছে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন চার্লি হোল্টজ। ফলে যারা বর্তমানে কন্ডাক্টরের ক্লাউডভিত্তিক সেবা ব্যবহার করছেন, তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আগেভাগেই সংরক্ষণ করে রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তবে আগামী বছরের শুরুতে গ্রাহকদের জন্য নতুন পণ্য বা সুবিধা নিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা। মেটার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও এআই গবেষণার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে কন্ডাক্টরের প্রযুক্তিতে নতুন উন্নয়ন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এআই প্রতিযোগিতায় মেটার নতুন কৌশল
বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। ওপেনএআই, গুগল, অ্যানথ্রপিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উন্নত এআই মডেল ও এজেন্ট প্রযুক্তি তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এই প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে মেটাও সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে।
গত আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব কোডিং এজেন্ট মিউজ কোড চালু করে। এর মাধ্যমে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে মেটা। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির নতুন মিউজ এজেন্ট সেবাটিও দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। মেটার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এই সেবার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ইতিমধ্যে এক কোটি ছাড়িয়েছে।
এআই সক্ষমতা বাড়াতে গত এক বছরে একাধিক প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে মেটা। এর মধ্যে ভাইরাল এআই এজেন্ট প্ল্যাটফর্ম মল্টবুক অধিগ্রহণ নিয়েও প্রযুক্তি খাতে আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু এআই মডেল তৈরি নয়, বরং এআই এজেন্টকে দৈনন্দিন কাজ, সফটওয়্যার নির্মাণ ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় কার্যকরভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, কন্ডাক্টর অধিগ্রহণ মেটার এই কৌশলেরই একটি অংশ। কারণ, ভবিষ্যতে সফটওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রে একাধিক এআই এজেন্টের সমন্বিত ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি এজেন্টের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন কাজের জন্য একাধিক এজেন্টকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রযুক্তি সফটওয়্যার উন্নয়নের প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
কন্ডাক্টরের প্রযুক্তি মেটার বিদ্যমান এআই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হলে প্রতিষ্ঠানটি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে আরও সমন্বিত সেবা তৈরির সুযোগ পাবে। বিশেষ করে মিউজ কোড ও মিউজ এজেন্টের মতো উদ্যোগের সঙ্গে এ ধরনের প্রযুক্তির সমন্বয় ভবিষ্যতে মেটার এআই পণ্যকে আরও কার্যকর করতে পারে।
কন্ডাক্টর অধিগ্রহণকে কেবল একটি স্টার্টআপ কেনার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এআই এজেন্টনির্ভর সফটওয়্যার উন্নয়নের ভবিষ্যৎ বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে মেটার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে এই উদ্যোগকে। আগামী বছরের শুরুতে কন্ডাক্টরের পক্ষ থেকে নতুন কী সেবা বা প্রযুক্তি নিয়ে আসা হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টদের।
পড়ুন:জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
ইমি/


