শামীমের বদলির পরও ইডিসিএলে কথিত সিন্ডিকেটের দাপট! নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার অনিয়ম ও সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ

এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) ঘিরে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি ম্যানেজার শামীম আহমেদ। তাঁর বিরুদ্ধে পারিবারিক আত্মীয়কে চাকরিতে নিয়োগে প্রভাব বিস্তার, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শামীম আহমেদকে বগুড়ায় বদলি করা হলেও প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কথিত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বরকতুল রইস তুষার সিন্ডিকেট নামে পরিচিত এই চক্রের সদস্যরা এখনো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে একজন কর্মকর্তার বদলির পরও প্রতিষ্ঠানের কথিত অনিয়মের চিত্রে পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জুলাই যোদ্ধার পরিচয় সামনে রেখে আত্মীয়কে নিয়োগের অভিযোগ

এসেনশিয়াল ড্রাগসের বগুড়া কার্যালয়ে ছাব্বির আহমেদের নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, জুলাই যোদ্ধার পরিচয়কে সামনে রেখে শামীম আহমেদের শ্বশুরবাড়ির এক আত্মীয়কে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তি শামীম আহমেদের ভায়রা বলে দাবি করা হচ্ছে।

প্রাপ্ত নিয়োগপত্র অনুযায়ী, ছাব্বির আহমেদকে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের বগুড়া কারখানায় ‘সহকারী প্রোডাকশন কর্মকর্তা (ইলেকট্রিক্যাল)’ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নথিতে তাঁর মাসিক বেতন ৯ হাজার ৭০০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। নিয়োগপত্রে ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বগুড়া কারখানার প্রোডাকশন বিভাগে যোগদানের নির্দেশনার তথ্যও রয়েছে।

নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং পারিবারিক সম্পর্ক কোনোভাবে প্রভাব ফেলেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। নিয়োগসংক্রান্ত নথি ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

শামীমের বদলির পরও বহাল কথিত সিন্ডিকেট

বিতর্কিত শামীম আহমেদকে বগুড়ায় বদলি করা হলেও ইডিসিএলে কথিত বরকতুল রইস তুষার সিন্ডিকেটের প্রভাব এখনো বহাল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।

অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হিসেবে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁরা হলেন—

১. সেলিম জাবেদ — ক্রয় কর্মকর্তা।
২. সরোয়ার — ক্রয় কর্মকর্তা।
৩. রফিকুল ইসলাম — এমডি দপ্তরের ডেপুটি ম্যানেজার।
৪. মোহাম্মদ ইসমাইল — পরিচালক, কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স (চলতি দায়িত্ব)।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং তাঁদের প্রভাব এখনো বিদ্যমান। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ অবস্থায় ইডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুজ্জামানের ভূমিকা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।

বদলির পর সরকারি গাড়ি ব্যবহারের অভিযোগ

শামীম আহমেদের বগুড়ায় যোগদানকে কেন্দ্র করে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ঢাকা মেট্রো-চ ৫৬-৫২৭০ নম্বরের একটি গাড়িতে করে বগুড়া অফিসে যোগদান করতে যান এবং পরবর্তী সময়ে একই গাড়িতে ঢাকায় ফিরে আসেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, বদলি ও যোগদানসংক্রান্ত ব্যক্তিগত যাতায়াতে প্রতিষ্ঠানের গাড়ি ব্যবহারের বিষয়টি ইডিসিএলের প্রচলিত নিয়ম ও প্রশাসনিক বিধিমালার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন। গাড়িটির বরাদ্দ, ব্যবহারের অনুমোদন এবং যাতায়াতের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ওই গাড়ির চালক হিসেবে নাসির নামের এক ব্যক্তির পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জ বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নাসির আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বি-২১৩৭ সিবিএর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

বদলি বাণিজ্য ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ

প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করেও শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি ও পদায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের ঘটনা শুধু চাকরিবিধির লঙ্ঘন নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও কর্মপরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক।

এ ছাড়া প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি, চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো এবং বদলি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য ও প্রশাসনিক নথি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

ইডিসিএলের টেন্ডার ও ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের ঘটনা ঘটেছে।

আর্থিক লেনদেন ও অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ

চাকরি, বদলি, পদায়ন ও অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধাকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও শামীম আহমেদকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
বিশেষ করে ছাব্বির আহমেদের নিয়োগের ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্পর্ক, প্রার্থীর যোগ্যতা, নিয়োগের নির্বাচনী পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা স্পষ্ট।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি

এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড দেশের গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এমন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, টেন্ডার ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, জনস্বার্থেরও বিষয়।

শামীম আহমেদকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, তাঁর বদলির পরও কথিত সিন্ডিকেটের প্রভাব বহাল থাকার দাবি এবং সরকারি গাড়ি ব্যবহারের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ইডিসিএলের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অভিযোগের বিষয়ে কেবল অভ্যন্তরীণ আশ্বাস নয়, বরং নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত প্রয়োজন। নিয়োগসংক্রান্ত নথি, বদলি ও পদায়নের আদেশ, টেন্ডার ও ক্রয়সংক্রান্ত রেকর্ড, গাড়ি ব্যবহারের লগবুক এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা সম্ভব।

পড়ুন:শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্বভৌমত্ব চূড়ান্তভাবে রক্ষা করেছিলেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ইমি/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন