সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশেই প্রতিহত করার দাবি করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। নতুন করে এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার (৮ নভেম্বর) সৌদি কর্তৃপক্ষ দেশটির পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম, আল-আহসা ও আবকাইক এলাকায় সম্ভাব্য হামলার সতর্কতা জারি করে। সতর্কতা জারির কয়েক মিনিট পর কর্তৃপক্ষ জানায়, হুথিদের নিক্ষেপ করা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
হামলার আশঙ্কায় সৌদি কর্তৃপক্ষ স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলের কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ না করার জন্যও সতর্ক করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে সাধারণ মানুষকে সতর্কতা মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি কোথা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, এর লক্ষ্যবস্তু কী ছিল কিংবা প্রতিহত করার সময় কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। হামলার বিষয়ে হুথিদের পক্ষ থেকেও বিস্তারিত বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
গত জুলাই থেকে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনা বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই পক্ষের সামরিক তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন তুলনামূলক শান্ত থাকা সৌদি-হুথি সম্পর্ক আবারও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগের দিনই ইয়েমেনের রাজধানী সানার একটি গ্রামে সৌদি বিমানবাহিনী বিমান হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপরই সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ফলে একের পর এক হামলা ও পাল্টা হামলায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
জুলাইয়ের আগে দীর্ঘ সময় সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বজায় ছিল। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের অভিযানের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন সংঘাত চললেও পরবর্তী সময়ে উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু জুলাইয়ে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের মধ্যে আবারও সংঘাত শুরু হয়। এর ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নতুন করে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার বিরোধও নতুন করে সামনে আসে।
এরপর থেকে সৌদি আরব নিয়মিতভাবে হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়ে আসছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাল্টা জবাবে হুথি গোষ্ঠীও সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অঞ্চল লক্ষ্য করে হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির পূর্বাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ও তেল উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে। ফলে এই অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে তা শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষ করে দাম্মাম, আল-আহসা ও আবকাইক অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল। এসব এলাকায় কোনো ধরনের হামলা বা অবকাঠামোগত ক্ষতি হলে তার প্রভাব জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের মানবিক সংকটও আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশটিতে দীর্ঘদিনের যুদ্ধের কারণে খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরব লক্ষ্য করে হুথিদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলার ঘটনা দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করার দাবি করলেও পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এই সংঘাতের প্রভাব কতটা বিস্তৃত হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
পড়ুন:বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ইরানের কেশম দ্বীপ
ইমি/


