পিঠে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার নিয়ে প্রায় এক হাজার ৪৬ কিলোমিটার নৌপথ ঘুরেছে সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়া পাঁচ কুমির। লবণাক্ততার কারণে স্যাটেলাইট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাদের সঙ্গে বন বিভাগের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কুমিরগুলো এখন কোথায়, কী অবস্থায় আছে– জানা যায়নি।
সুন্দরবনে কুমিরের জীবনাচরণ, অধিক্ষেত্র, বিতরণ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ধারণা পেতে গত বছর ১৩ মার্চ প্রথমবার দুটি কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার লাগানো হয়। পর্যায়ক্রমে আরও তিনটি কুমিরের শরীরে স্যাটেলাইট লাগিয়ে সুন্দরবনের খালে ছাড়া হয়। ১২৭ দিন পর্যন্ত স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার সচল ছিল।
চারটি কুমির সুন্দরবনের ভেতরের খালেই চলাচল করে। জোংড়া নামে একটি কুমির বাগেরহাট, বরিশাল, পিরোজপুর ঘুরে আবার সুন্দরবনে ফিরেছে। শিকার খোঁজা, খাবার, ডিম পাড়ার জন্য কুমিরগুলো ২৪ ঘণ্টায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার এলাকায় ঘোরাঘুরি করে।
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা নির্মল কুমার পাল জানান, কুমিরের জীবনাচরণ কেমন, কত জায়গা নিয়ে তারা ঘোরাফেরা করে, কতদূর পর্যন্ত বিচরণ করে, এক জায়গায় কত সময় থাকে, সুন্দরবনের বাইরে যায় কিনা– এসব নিয়ে আমাদের ধারণা নেই। মূলত এসব বিষয়ে জানতেই এ গবেষণার সিদ্ধান্ত হয়।
গবেষণাকাজে নেতৃত্ব দিয়েছে আইইউসিএনের বাংলাদেশ দল। তাদের সহযোগিতা করছে জার্মান ফেডারেল মিনিস্ট্রি ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। আইইউএসএনের ‘ইন্টিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভস অ্যান্ড দ্য মেরিন প্রটেকটেড এরিয়া সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়।
গবেষণার সুবিধার জন্য পাঁচটি কুমির সংগ্রহ করে আলাদা নাম দেওয়া হয়– জুলিয়েট, মধু, পুটিয়া, জোংড়া ও হারবারিয়া। এর মধ্যে জুলিয়েট, মধু, পুটিয়া ছিল স্ত্রী কুমির। হারবারিয়া ও জোংড়া পুরুষ।
গত বছর ১৩ মার্চ জুলিয়েট ও মধুর পিঠে স্যাটেলাইট স্থাপন করে ভদ্রা খালে ছাড়া হয়। ১৪ মার্চ হারবারিয়াকে হারবারিয়া খালে, ১৫ মার্চ জোংড়াকে জোংড়া খালে ছাড়া হয়। এর পর ৯ মাস বিরতি দিয়ে গত ২৬ জানুয়ারি চরপুটিয়া খালে ছাড়া হয় পুটিয়া নামের কুমিরটি।
গবেষণা দলের সদস্য মফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটারগুলো তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইল্ডলাইফ কম্পিউটার নামে প্রতিষ্ঠান। দেখা গেছে, জুলিয়েটের স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার ৭১ দিন, মধুর ১২৭ দিন, পুটিয়ার ৮৩ দিন, হারবারিয়ার ৫২ দিন ও জোংড়ার ট্রান্সমিটার ৬৪ দিন সচল ছিল। গত ১৯ এপ্রিল পুটিয়ার সর্বশেষ উপস্থিতি জানা গেছে। এর আগে গত বছর জুলাইয়ে অন্য চারটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়।
গবেষণা দলের প্রধান আইসিইউএনের বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার এ বি এম সরোয়ার আলম দীপু বলেন, ‘নোনাপানির কুমিরের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট স্থাপন এটিই প্রথম। প্রাথমিক ধারণা ছিল, ৬০ থেকে ৭০ দিন পর্যন্ত তথ্য দিতে পারবে। কোনোটি কম চলেছে, কোনোটি বেশি দিন গেছে।’
গবেষণায় দেখা গেছে, স্যাটেলাইট সচল থাকা অবস্থায় জুলিয়েট ১৪৫, মধু ১৭০, পুটিয়া ২০৪, হারবারিয়া ৫১ ও জোংড়া ৪৭৩ কিলোমিটার নৌপথ ঘুরেছে।
সরোয়ার আলম দীপু বলেন, কুমিরগুলো দিনে কতটুকু পথ যায়, তাদের অধিক্ষেত্র কতটুকু– এসব বিষয়ে আগে ধারণা ছিল না। এখন মোটামুটি ধারণা হয়েছে।
পড়ুন: খুলনা জেলা পরিষদের অফিস সহকারী আসলামকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক
এস/


