সুস্থ থাকতে হলে ব্যায়াম, ভালো খাবার, নিয়ম করে হাঁটা—এসব আমরা সবাই জানি। কিন্তু বাস্তব জীবন কি সত্যিই এত সহজ? সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের চাপ, পরিবার সামলে জিমে যাওয়ার সময় কই! অনেকের কাছে ‘নিয়মিত ব্যায়াম’ শব্দটিই তাই একধরনের চাপ।
তবে সুস্থ থাকার পথ হয়তো এত কঠিন না। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকেও আলাদা কোনো ব্যায়াম না করেই কমাতে পারেন স্বাস্থ্যঝুঁকি। এ জন্য দিনে মাত্র কয়েক মিনিটের ছোট ছোট চলাফেরা করতে হবে। চলুন জেনে নিই, ব্যায়াম না করেও কীভাবে ব্যায়ামের উপকার পাওয়া সম্ভব।
ছোট কাজ, বড় পরিবর্তন
একটু দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, ঘরের কাজ করতে করতে দ্রুত হাঁটা কিংবা সন্তান বা পোষা প্রাণীর সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ করে খেলা—এই কাজগুলোকে আমরা সাধারণ কাজ হিসেবেই দেখি। কিন্তু এই কাজগুলোই হতে পারে আপনার শরীরের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ব্যায়াম। এই ধারণার নাম ভিআইএলপিএ (ভিগোরাস ইন্টারমিটেন্ট লাইফস্টাইল ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি)। সহজ ভাষায়, দৈনন্দিন জীবনের কাজগুলো একটু বেশি জোর ও শক্তি দিয়ে করা।
ভিআইএলপিএ কী?
গত তিন বছরে আপনি যদি ব্যায়াম বিষয়ে একটু চোখ-কান খোলা রেখে থাকেন, তাহলে হয়তো একটি নতুন শব্দ শুনেছেন—ভিআইএলপিএ। ভিআইএলপিএ হলো দিনের ফাঁকে ফাঁকে খুব অল্প সময়ের জন্য একটু জোরে নড়াচড়া বা শারীরিক কাজ, যাকে বলে এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং, স্ন্যাকটিভিটি বা অ্যাক্টিভিটি মাইক্রোবার্স্টস। এর মূল লক্ষ্য হলো যাঁদের নিয়মিত ব্যায়াম করতে সময় বা আগ্রহ নেই, তাঁদের দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই বেশি নড়াচড়া করতে উৎসাহ দেওয়া।
গবেষণায় মিলেছে চমকপ্রদ ফল
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের ২৫ হাজার ২৪১ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেন, প্রতিদিন মাত্র তিন থেকে চারবার, প্রতিবার ১ মিনিটের ভিআইএলপিএ করলেই অকালমৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যায়। হৃদ্রোগজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি কমে প্রায় ৪৯ শতাংশ।
আরও সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, প্রতিদিন ৪ মিনিটের একটু বেশি ভিআইএলপিএ দীর্ঘ সময় বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে হৃৎস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে। হ্যামার ও তাঁর সহকর্মীরা অবাক হয়ে দেখেছেন, এই ছোট ছোট নড়াচড়াও স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারী।
গবেষণায় যেভাবে উঠে এল ভিআইএলপিএ
যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম বা খেলাধুলা করেন না, তাঁদের ওপর হ্যামার ও তাঁর সহকর্মীরা গবেষণা করছিলেন। সেখানে তাঁদের হাতে পরানো হয়েছিল কবজিতে পরার উপযোগী ডিভাইস। গবেষকেরা লক্ষ করলেন—জিমে না গেলেও অনেক মানুষ দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই যথেষ্ট নড়াচড়া করছেন। যেমন কাজে যাওয়ার পথে হঠাৎ দ্রুত হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা।
এইচআইআইটি–র সহজ সংস্করণ
গত এক দশকে এইচআইআইটি (হাই ইনটেনসিটি ইন্টারভ্যাল ট্রেইনিং) বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এতে অল্প সময়ের জন্য শরীরকে বেশি পরিশ্রম করানো হয়, যা হৃৎস্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক মার্ক হ্যামার বলেন, ‘ভিএলপিএ আসলে এইচআইআইটি-রই ছোট ও সহজ সংস্করণ।’ এর মানে হলো জিম বা যন্ত্রপাতি ছাড়াই দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই এক-দুই মিনিটের জন্য হৃৎস্পন্দন বাড়ানো। গবেষণায় দেখা গেছে, এইচআইআইটি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল, রক্তচাপ ও শরীরের চর্বি কমাতে কার্যকর।
বয়স বাড়লেও উপকার
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি আব সিডনির গবেষক ম্যাথু আহমাদি জানান, দিনে কয়েকবার অল্প সময়ের জন্য জোরে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তিনি বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর দুর্বল হয়ে পড়া ঠেকাতেও ভিআইএলপিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পড়ুন- চিকিৎসকদের মতে, যে খাবারগুলো লিভারে চর্বি কমায় আর যেসব বিপদের কারণ


