রাজধানীর নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) একটি সাবস্টেশন ভবনের পলেস্তারা ও টাইলস খসে পড়ে বড় ধরনের এক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
শুক্রবার জুমার নামাজের সময় নিকুঞ্জ কেন্দ্রীয় মসজিদ-সংলগ্ন ডেসকোর বহুতল এই সাবস্টেশন ভবনে এ ঘটনা ঘটে। এতে অল্পের জন্য পথচারীরা প্রাণে বেঁচে গেলেও একটি ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, দুপুর পৌনে ২টার দিকে, যখন মসজিদের ভেতরে শত শত মুসল্লি জুমার নামাজে মগ্ন ছিলেন, ঠিক তখনই বিকট শব্দে ডেসকো ভবনের উপরিভাগ থেকে ভারী টাইলসের বিশাল একটি অংশ নিচের প্রধান সড়কের ওপর ধসে পড়ে।
এস এম ফজলে রাব্বি পল্লব নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত গাড়িটি মসজিদের পাশের রাস্তায় পার্ক করে নামাজে গিয়েছিলেন। নামাজ শেষে ফিরে তিনি দেখেন, তার প্রিয় গাড়িটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পড়ে আছে এবং সেটির ওপর সাবস্টেশন ভবনের টাইলসের স্তূপ।
মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থলে শত শত উৎসুক জনতা ও মুসল্লিরা ভিড় জমান। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির অবস্থা দেখে উপস্থিত জনতা শিউরে ওঠেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, ঠিক যে মুহূর্তে টাইলসগুলো খসে পড়েছে, তখন ওই স্থানে কোনো মানুষ থাকলে প্রাণহানি ছিল অবধারিত।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ডেসকোর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনের নির্মাণকাজে চরম অবহেলা ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করার কারণেই আজ এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের জীবনের চেয়ে যেন এখানে ইটের দেয়াল আর টাইলসের চাকচিক্যই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিক পল্লব তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি ডেসকো কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এমন একটি ভয়াবহ জীবনের ঝুঁকির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশের পরিবর্তে কর্তৃপক্ষ তাকে কেবল একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দিয়ে দায় সেরেছে।
কর্তৃপক্ষের এই উদাসীনতা স্থানীয়দের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর প্রতিবাদে উপস্থিত জনতা ডেসকোর অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের দাবি, আজ শুধু একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; কিন্তু কাল যদি কোনো শিশুর বা পথচারীর মাথায় এই পাথর পড়ত, তবে সেই লাশের দায়ভার কে নিত?
নিকুঞ্জ এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন, এই বহুতল ভবনটির দেয়াল থেকে টাইলস খুলে পড়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ছোটখাটো অংশ খসে পড়ার নজির রয়েছে, যা ভবনটির স্থায়িত্ব ও নির্মাণশৈলী নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে। একটি জনবহুল এলাকায়, বিশেষ করে মসজিদের পাশে, এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কার্যত একটি ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। ভবনটির গা থেকে যেভাবে টাইলস লেপটে থাকার বদলে আলগা হয়ে ঝরছে, তাতে যেকোনো সময় বড় ধরনের ট্র্যাজেডি ঘটে যেতে পারে।
কোনো দুর্ঘটনাকেই তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই। আজ যে ঘটনাটি কেবল একটি গাড়ির ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা অনায়াসেই কয়েক ডজন মানুষের শোকাতুর মিছিলে পরিণত হতে পারত। ডেসকোর এই সাবস্টেশন ভবনের নির্মাণে কোনো রড-সিমেন্টের কারচুপি ছিল কি না, কিংবা টাইলস বসানোর ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত ত্রুটি ছিল কি না—তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত ভবনে যদি জনগণের জানমালের নিরাপত্তা না থাকে, তবে সেই উন্নয়নের সার্থকতা কোথায়?
নিকুঞ্জবাসীর দাবি, এই ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং ভবন নির্মাণে চরম অবহেলা ও তদারকির অভাবের এক জীবন্ত দলিল। আজ একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কিন্তু কাল কোনো প্রাণ ঝরবে না—তার গ্যারান্টি কে দেবে? সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডেসকো কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত এই ‘মরণফাঁদ’ সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই এখন সর্বস্তরের প্রত্যাশা।
পড়ুন : সরকারি জমি দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ আ.লীগ নেত্রীর বিরুদ্ধে


