সরকারি দপ্তরের আনুষ্ঠানিকতা আর কাগুজে প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক মানবিক উদাহরণ হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। সাপ্তাহিক গণশুনানিতে আসা অসহায়, দুস্থ ও চিকিৎসা সংকটে পড়া মানুষদের কথা ধৈর্য সহকারে শুনে তাৎক্ষণিক সহায়তা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন অনেকের শেষ আশ্রয়স্থল।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অফিস সহায়ক মোঃ তারেক হোসেনের একমাত্র মেয়ে প্রায় দুই মাস ধরে ভয়াবহ চর্মরোগে ভুগছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে তাকে বৃদ্ধ পিতামাতা ও ভাইবোনের দায়িত্বও বহন করতে হয়। অল্প বেতনে সংসার চালিয়ে মেয়ের চিকিৎসা করাতে হিমশিম খাওয়ার কথা আজ বুধবার ( মার্চ ৪) জানালে জেলা প্রশাসক তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং সুচিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা ও ভবিষ্যতেও পাশে থাকার আশ্বাস দেন। আবেগাপ্লুত তারেক বলেন, “স্যার একজন মানবিক ডিসি। তিনি এখানে আসার পর থেকে তার কাজগুলো দেখে-শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে।”
একই গণশুনানিতে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মোঃ আলাউদ্দিন তার অসুস্থ স্ত্রী হেনা আক্তারের চিকিৎসা ব্যয়ের সংকটের কথা তুলে ধরেন। প্রতিদিন প্রায় দুইশত টাকা ওষুধ বাবদ খরচ হয়, যা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে তার জন্য কষ্টসাধ্য। দুই মেয়ে ও এক ছেলের পড়াশোনার খরচসহ সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া এই কর্মচারীকেও নিরাশ করেননি জেলা প্রশাসক। আলাউদ্দিন বলেন, “স্যার দীর্ঘক্ষণ আমার কথা শুনেছেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা করেছেন।”
আকবরশাহ থানার পূর্ব ফিরোজশাহ কলোনীর মোঃ রিয়াজ, যিনি অসুস্থতার কারণে দিনমজুরির কাজ করতে পারছেন না—তার আবেদনেও সাড়া দেন জেলা প্রশাসক। একই এলাকার অসুস্থ মোঃ হাশেমও পেয়েছেন আর্থিক সহায়তা।
ডবলমুরিং থানার পশ্চিম মাদারবাড়ী এলাকার সৃজন মিয়া দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। তার স্ত্রী আর্থিক সহায়তার আবেদন নিয়ে আসলে জেলা প্রশাসক চিকিৎসা ও সংসার খরচের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা গ্রামের নাভিদ আনজুম, চট্টগ্রাম কলেজের ডিগ্রি (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্বল্প আয়ের কৃষক পিতার পক্ষে তার পড়াশোনার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বই-পুস্তক, পরীক্ষার ফি ও অন্যান্য শিক্ষাব্যয় মেটাতে সহযোগিতা চান তিনি। জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করলে নাভিদ বলেন, “এই জেলা প্রশাসকের সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে তিনি অসহায় মানুষের কথা ধৈর্য সহকারে শুনেন এবং পাশে দাঁড়ান।”
নেত্রকোণা সদর থানার মদনপুর গ্রামের মোঃ ফয়সাল, যিনি বাংলাদেশ পুলিশ ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে দুর্ঘটনায় হাঁটুর লিগামেন্ট ইনজুরিতে আক্রান্ত হন, জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আসেন। তিনি আর্থিক সহায়তা পেলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে জানান এবং সমাজের স্বচ্ছল ব্যক্তিদের সহযোগিতা কামনা করেন।
ডবলমুরিংয়ের পশ্চিম মাদারবাড়ীর বিধবা মোছাম্মৎ ফাতিমা বেগম মানুষের বাড়িতে কাজ করে দুই সন্তানকে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ঈদের আগে সন্তানদের পোশাকের জন্য সহায়তা চাইলে জেলা প্রশাসক হাসিমুখে তার আবেদন মঞ্জুর করেন।
এদিন গণশুনানিতে মোট ২০ জন সেবাপ্রত্যাশীর আবেদন শোনা হয়। অসুস্থ আটজন নাগরিক ও এক শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি পাঁচজন দুস্থ মহিলাকে নগদ সহায়তার পাশাপাশি চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, মরিচ, হলুদ ও ধনিয়া গুঁড়া সম্বলিত ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়। বিভিন্ন আবেদন ও অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসকের গণশুনানি যেন এখন কেবল একটি প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়, বরং অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, ধৈর্য এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত—এই তিন গুণে জাহিদুল ইসলাম মিঞা হয়ে উঠেছেন অনেকের কাছে ভরসার আরেক নাম।
পড়ুন:কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান ছুরিকাঘাতে নিহত
দেখুন:ঢাকা ৭, ৯, ১১ ও ১৮ আসনের প্রাপ্ত ফলাফল | Nagorik TV
ইমি/


