খুলনা নগরীর প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলা মোড়ে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে শ্রমিকদল নেতা মাসুম বিল্লাহকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, আধিপত্য বিস্তার ও পুরনো বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় সন্ত্রাসী গ্রুপ ‘বি কোম্পানির’ আটজন সদস্য। প্রত্যেক কিলারকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।
ঘটনার সময় গুলি করা শুটার অশোক ঘোষকে ৫০ হাজার টাকায় ভাড়া করা হয়েছিল। তাকে দেওয়া হয়েছিল ইতালির তৈরি একটি নতুন নাইন এমএম পিস্তল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য জানিয়েছে অশোক ঘোষ।
বুধবার রাত ৯টার দিকে নগরীর ব্যস্ততম ডাকবাংলা মোড়ের বাটা শোরুমের ভেতরে মাসুম বিল্লাহকে ধাওয়া করে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পালানোর সময় স্থানীয়দের সহায়তায় ট্রাফিক পুলিশের টিআই মাহমুদ আলম অস্ত্রসহ অশোক ঘোষকে আটক করেন। পরে রাতেই তাকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে জাভেদ নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
নিহত মাসুম বিল্লাহ রূপসা উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক ছিলেন। তার বাড়ি রূপসা উপজেলার বাগমারা পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন এলাকায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা ও একটি অস্ত্র মামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার আগে মাসুম বিল্লাহ ডাকবাংলা মোড় থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে পিকচার প্যালেস মোড়ে অবস্থান করছিলেন। এ সময় কয়েকজন সন্ত্রাসী তাকে ধাওয়া দেয়। তিনি দৌড়ে গিয়ে বাটা শোরুমের ভেতরে আশ্রয় নেন।
কিন্তু সন্ত্রাসীরা পিছু নিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে কোপাতে থাকে। একপর্যায়ে হেলমেট পরা এক যুবক কাছ থেকে তার বুক লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ক্যাশ কাউন্টারের সামনে লুটিয়ে পড়েন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পুরো হত্যাকাণ্ডটি মাত্র ৩ থেকে ৫ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যায়। এরপর হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
বাটা শোরুমের ম্যানেজার জানান, দোকানে তখন প্রচুর ক্রেতা ছিল। হঠাৎ এক ব্যক্তি দৌড়ে দোকানে ঢুকে পড়েন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন যুবক তাকে আক্রমণ করে। আতঙ্কে কর্মচারী ও ক্রেতারা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন।
খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) তাজুল ইসলাম বলেন, হত্যামিশন সফল করতে ‘বি কোম্পানির’ তিনটি গ্রুপ কাজ করেছে। একটি গ্রুপ সরাসরি হামলায় অংশ নেয়, যাদের মধ্যে দুজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। দ্বিতীয় গ্রুপের সদস্যদের হাতে ছিল দেশীয় ধারালো অস্ত্র। আর তৃতীয় গ্রুপের কাজ ছিল হামলাকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।
তিনি জানান, কিলিং মিশনে মোট আটজন সদস্য অংশ নেয়। এদের মধ্যে অশোক ঘোষ ও জাভেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে এবং তাদের ধরতে অভিযান চলছে।
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগে নগরীর ময়লাপোতা মোড়ে কিলাররা একত্রিত হয়। সেখানেই তাদের কাছে অস্ত্র হস্তান্তর করা হয়। এরপর মাসুম বিল্লাহর অবস্থান নিশ্চিত করে পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালানো হয়।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবীর হোসেন বলেন, নিহতের শরীরে তিনটি গুলির চিহ্ন ও একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, “গ্রেপ্তার অশোক ঘোষ একজন পেশাদার কিলার। জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না।”
অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে একটি মামলা করেছেন। পাশাপাশি নিহতের পরিবারও হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ঈদ সামনে রেখে নগরীর ব্যস্ত এলাকায় এমন প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, শহরের প্রাণকেন্দ্রে এমন ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও পুরনো বিরোধকে কেন্দ্র করে নগরীতে সহিংসতা বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মাসুম বিল্লাহর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহতের ছেলে রেজওয়ান হোসাইন মিনা বলেন, “আমার বাবাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।”
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যার নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
পড়ুন- দেওয়ানগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির হাতে ২২ হাজার ভারতীয় রুপি সহ দুইজন আটক
দেখুন- দীর্ঘমেয়াদে যু/দ্ধ শুরুর আগেই সংকটে ইস/রা/য়ে/লের সামরিক খাত!


