৩০ চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ—একটি বছরের শেষ প্রান্ত। কেবল পঞ্জিকার হিসাবেই নয়, এটি মানসিক পরিশুদ্ধিরও এক প্রতীকী সময়। সারা বছরের জীর্ণতা, ব্যর্থতা আর ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয় এই দিন। তাই চৈত্র সংক্রান্তি একই সঙ্গে সমাপ্তি ও সূচনার এক সেতুবন্ধন। ফলে চৈত্রসংক্রান্তির বার্তাতেই পাওয়া যায় বাংলা নববর্ষের আগমন।
এবারের নববর্ষ একটু অন্যরকম বার্তা নিয়ে আসছে আমাদের জীবনে। নতুন সরকার, নতুন আয়োজন। তারপরও পুরনো আয়োজনেই থাকতে হবে আমাদের। পুরনোর সঙ্গে নতুনের যোগফলই হবে নতুন বর্ষের পথচলা।
পয়লা বৈশাখে মানে আনন্দ আয়োজন। আর তাই রাজধানী জুড়েই থাকছে অনেক অনেক আয়োজন। এই দিনটি ঘিরেই রয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। এতসব আয়োজনের ভিড়ে বর্ষবরণ কোথায় করবেন, তা নিয়ে অনেকেই পড়ে যান দোটানায়। এজন্য ঢাকায় বর্ষবরণের ৯টি বড় আয়োজনগুলোর খোঁজখবর তুলে ধরা হয়েছে।
ছায়ানটের অনুষ্ঠান ও শোভাযাত্রা : দুই যুগ আগে রমনা বটমূলে বোমা হামলার ভয়াবহতার স্মৃতি মাথায় রেখেই এবারও সেই স্থানেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন ঘিরে নেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সম্ভাব্য যে কোনো অপচেষ্টা মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে র্যাবের হেলিকপ্টার, পাশাপাশি ইউনিফর্মধারী সদস্যদের ফুট পেট্রোল ও টহলকে ভাগ করে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সকাল ৬টা ১৫ মিনিট থেকে ৮টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত চলবে। নির্ধারিত কয়েকটি গেট দিয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকবে এবং নারী-পুরুষ ও শিল্পীদের জন্য আলাদা গেট নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈশাখী শোভাযাত্রা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার উদ্যোগে সকাল ৯টায় শুরু হবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা, যা চারুকলা থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর হয়ে আবার চারুকলায় এসে শেষ হবে। শোভাযাত্রার পুরো রুট থাকবে কঠোর নিরাপত্তার আওতায়। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে। বিকেল ৫টার পর রমনা পার্কের সব গেট শুধু বের হওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। ৬টার পর আর কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর : বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে আবারও বসছে হাজারো কণ্ঠের মিলনমেলা। চ্যানেল আই এবং সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে আগামী ১ বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) ভোর ৫টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ‘হাজারও কণ্ঠে বর্ষবরণ’। বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩-কে স্বাগত জানাতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সুরের ধারার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীরা অংশ নেবেন। সম্মিলিত কণ্ঠে বাংলা গানের সুরে মুখর হয়ে উঠবে পুরো প্রাঙ্গণ। এবারের আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করবেন দেশের খ্যাতিমান শিল্পীরা। তাদের মধ্যে আছেন রফিকুল আলম, ফাহিম হোসেন চৌধুরী, কিরণ চন্দ্র রায়, কোনাল ও লুইপাসহ তরুণ প্রজন্মের আরও অনেক শিল্পী। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করবেন দীপ্তি চৌধুরী এবং আবৃত্তিতে থাকবেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। ১৩ এপ্রিল বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে একই স্থানে অনুষ্ঠিত হবে চৈত্র সংক্রান্তির বিশেষ আয়োজন। এতে গান পরিবেশন করবেন বুলবুল ইসলাম, চন্দনা মজুমদার, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, প্রিয়াংকা গোপ ও স্বাতী সরকার। আবৃত্তিতে অংশ নেবেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডালিয়া। নৃত্য পরিবেশনায় থাকবেন ওয়ার্দা রিহাব ও প্রেমা। উপস্থাপনা করবেন সামান্তা ইসলাম ও সানজিদা। বর্ষবরণ উপলক্ষে রবীন্দ্র সরোবরে থাকবে বৈশাখী মেলার আয়োজনও। মেলায় পাওয়া যাবে নানা ধরনের তৈজসপত্র, ঐতিহ্যবাহী মাটির খেলনা এবং নাগরদোলাসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা উপকরণ।
যাত্রাবিরতির বৈশাখী উৎসব : রাজধানীর বনানীতে দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজন করেছে যাত্রাবিরতি। আয়োজনে থাকছে বাউলগান, নাচ, পুতুলনাচ। সঙ্গে থাকছে গ্রামীণ লোকজ মেলা ও ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ প্রদর্শনী। এ ছাড়া গান গাইবে সোনার বাংলা সার্কাস ব্যান্ড। ১৩ ও ১৪ এপ্রিল ৫০০ টাকার টিকিট কেটে প্রবেশ করা যাবে এই আয়োজনে।
আর্কা বৈশাখ ১৪৩৩ আলোকি, গুলশান : আর্কা কালেকটিভের আয়োজনে ১৩ ও ১৪ এপ্রিল রাজধানীর গুলশান–তেজগাঁও লিংক রোডের ‘আলোকি’তে আয়োজিত হচ্ছে ‘আর্কা বৈশাখ ১৪৩৩’। প্রথম দিন বেলা ২টায় শুরু হবে, আর দ্বিতীয় দিন বেলা ১১টা থেকে রাত পর্যন্ত নানা আয়োজনে মুখর থাকবে এ প্রাঙ্গণ। দুই দিনের আয়োজনকে ভাগ করা হয়েছে চারটি ভাগে—মেলা, খেলাঘর, ভোজনালয়, কালেকটিভ মঞ্চ। এ ছাড়া সেখানে পারফর্ম করবে কার্নিভ্যাল, রকসল্ট ও ফিরোজ জং ব্যান্ড। প্রতিদিনের টিকিট ৫০০ টাকা করে, কেনা যাবে ‘আলোকি’র ওয়েবসাইট থেকে।
বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা : বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ও বাংলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে ‘বৈশাখী মেলা ১৪৩৩’। টানা সাত দিনের এই মেলায় থাকছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী উপকরণ। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের থেকে শুরু করে বৈশাখী সাজসজ্জা, মাটির পণ্য, নকশিকাঁথা ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সমাহার পাবেন এখানে। ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে এই মেলা।
লাল বৈশাখী, কামাল আতাতুর্ক পার্ক, বনানী : নববর্ষ উপলক্ষে স্বাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে ‘রিশকা কানেক্টস’। মেলায় থাকছে নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, বৈশাখী ফটোবুথ থেকে শুরু করে বালিশ খেলা, মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো খেলা। এ ছাড়া দুই দিনের আয়োজনে কনসার্টে থাকছেন হাবিব ওয়াহিদ ও রেনেসাঁ, লেভেল ফাইভ, নেমেসিস ব্যান্ড। থাকছে স্ট্যান্ডআপ কমেডিও। প্রতিদিন ৩০০ টাকা টিকিটে প্রবেশ করা যাবে এই আয়োজনে।
এসএমই বৈশাখী মেলা, বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র, আগারগাঁও : পয়লা বৈশাখের আগেই শুরু হয়ে গেছে এই মেলা। চলবে ১২ থেকে ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে। মেলায় আছে ৩০০টির বেশি স্টল। এর মধ্যে দেড় শর বেশি উদ্যোক্তা স্টল ও ৩০টির বেশি ফুড স্টল। এ ছাড়া প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে থাকছে নাগরদোলা, বায়োস্কোপ, টিয়া পাখি খেলা, বানর খেলা। মেলায় প্রবেশের জন্য সাধারণ টিকিটের মূল্য ৩০ টাকা।
উৎসবে বৈশাখ, শেফস টেবিল কোর্টসাইড, মাদানী অ্যাভিনিউ, ভাটারা : ট্রিপল টাইম কমিউনিকেশনস ও কোর্টসাইডের সম্মিলিত আয়োজনে ১৪ এপ্রিল আয়োজন করা হচ্ছে ‘উৎসবে বৈশাখ’। যেখানে থাকছে আলপনা, পাপেট শো, বাউলগানের আসর, নাগরদোলা, লুডু খেলা। বেলা ৩টা থেকে শুরু হবে জমকালো কনসার্ট। আয়োজনে প্রবেশের টিকিট মূল্য ২০০ টাকা। কনসার্টে প্রবেশ করতে চাইলে খরচ করতে হবে ৮০০ টাকা।
প্রথম আলো বৈশাখী উৎসব, শেফস টেবিল কোর্টসাইড, মাদানী অ্যাভিনিউ, ভাটারা : পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আনন্দের রঙে আয়োজিত হচ্ছে ‘প্রথম আলো বৈশাখী উৎসব’। আয়োজনে থাকছে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, হাতের লেখা প্রতিযোগিতা, যেমন খুশি তেমন সাজো, জাদু প্রদর্শন, অরিগ্যামি ও ক্যারিকেচার, পুতুলনাচ, গল্প বলার আসর, টিয়া পাখির চিঠি, নাগরদোলা, দুরন্ত শৈশবের খেলা, কামারপাড়া-কুমারপাড়া, তাঁতিপাড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

