দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর অদূরে অবস্থিত খিলক্ষেত এলাকায় দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগের অবসানে অবশেষে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন।
শনিবার দুপুর ১২টা থেকে শুরু হওয়া টানা তিন ঘণ্টার সাঁড়াশি অভিযানে খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশ, ব্যস্ত ফুটওভার ব্রিজ এলাকা এবং নামাপাড়া বাজারমুখী মান্নান প্লাজা পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কের কয়েকশ অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই অভিযানে ভেঙে পড়েছে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে গড়ে ওঠা অবৈধ ‘হকার উপনিবেশ’। ফলে রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথে ফিরেছে বহু প্রতীক্ষিত শৃঙ্খলা, কমেছে যানজট, স্বস্তি ফিরেছে পথচারীদের চলাচলে। তবে এই স্বস্তি কতটা স্থায়ী হবে—সেই প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে।
খিলক্ষেত এলাকা দেশের অন্যতম ব্যস্ত ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি যাত্রীর যাতায়াত ঘটে এখানে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ দোকানপাট পুরো এলাকাকে পরিণত করেছিল এক বিশৃঙ্খল জনপদে। সড়কের বড় অংশ দখল করে ব্যবসা পরিচালনার ফলে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এই অংশে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ত, যার প্রভাব সরাসরি পড়ত বিমানবন্দরগামী ট্রাফিকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফুটপাত দখল করে স্থায়ী কাঠামোর মতো গড়ে উঠেছিল খাবারের দোকান, ফলের আড়ত, প্লাস্টিক পণ্যের স্তূপ এবং ভ্রাম্যমাণ পোশাকের দোকান। পথচারীদের জন্য নিরাপদ চলাচলের জায়গা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের জন্য এটি ছিল চরম ভোগান্তির এলাকা।
বারবার অভিযোগ ও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও এতদিন কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ জমে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাসোহারা বাণিজ্যের কারণেই এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বহাল ছিল।
শনিবারের অভিযানে খিলক্ষেত ক্যান্টনমেন্ট জোনের এডিসি মো. আবির হাসান এবং এসি নাজমুল হকের নেতৃত্বে পুলিশ কঠোর অবস্থান নেয়। অভিযান শুরু হতেই দখলদারদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। অনেকেই মালামাল ফেলে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে। বাঁশ, টিন ও প্লাস্টিকের তৈরি শতাধিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয় এবং ফুটপাত দখল করে রাখা মালামাল জব্দ করা হয়।
অভিযান চলাকালে সাধারণ মানুষ করতালির মাধ্যমে প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তাদের মনে রয়েছে সংশয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, উচ্ছেদের কিছুক্ষণের মধ্যেই আবারও দখল শুরু হয়। ফলে স্থানীয়দের দাবি—শুধু উচ্ছেদ নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাসোহারা আদায়ের সঙ্গে জড়িত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই দখলদারিত্ব নিয়ন্ত্রণ করত। এই চক্র ভাঙা না গেলে উচ্ছেদের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
উচ্ছেদ অভিযান শেষে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আলীম জানান, এটি কোনো এককালীন অভিযান নয়। উচ্ছেদকৃত এলাকাগুলোতে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং টিম কাজ করবে এবং পুনর্দখলের চেষ্টা হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সিসিটিভি নজরদারিও জোরদার করা হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত অবকাঠামো ও বিকল্প ব্যবস্থা। ফুটপাত সুরক্ষায় স্থায়ী বেষ্টনী নির্মাণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং হকারদের জন্য নির্দিষ্ট বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কেউ কেউ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর প্রস্তাবও দিয়েছেন।
বর্তমানে খিলক্ষেত এলাকায় যান চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। পথচারীরাও নির্বিঘ্নে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারছেন। তবে এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব এখন নির্ভর করছে প্রশাসনের ধারাবাহিক পদক্ষেপ এবং নাগরিকদের সচেতনতার ওপর।
খিলক্ষেত এখন এক নতুন সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে। এই শৃঙ্খলা যদি বজায় থাকে, তবে এটি রাজধানীর অন্যান্য সমস্যাপূর্ণ এলাকার জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। আর যদি নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে এই অভিযান ইতিহাসে আরেকটি ‘টোকেন অ্যাকশন’ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
দখলমুক্ত এই সড়ক সত্যিই মুক্ত থাকবে, নাকি আবারও দখলের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
পড়ুন : তীব্র লোডশেডিং নিয়ে সুখবর, সহনীয় পর্যায় আসবে যেদিন থেকে


