টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে নেমে এসেছে অজানা শঙ্কা। মেদী ও তেলেঙ্গাসহ বিভিন্ন বিলে হু হু করে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে কৃষকের স্বপ্নের বোরো ধান। আগাম বন্যার আশঙ্কায় প্রশাসনের জরুরি তাগিদে কৃষকেরা এখন আধাপাকা ধান কেটে ফসল বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় মাঠে নেমেছেন। তবে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র শ্রমিক ও জ্বালানি সংকট।
উপজেলার প্রধান উব্দাখালী নদীর ডাকবাংলো পয়েন্টে মঙ্গলবার বিকেল ৩টার দিকে পানি বিপদসীমার ২ দশমিক ৩১ মিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে উজানে টানা বৃষ্টির কারণে নদীর পানি দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ইতোমধ্যে সোনাডুবি, মহিশাশুরা, গোরাডোবা এবং আঙ্গাজুরাসহ বেশ কয়েকটি হাওরে পানি প্রবেশ করেছে। এতে বহু জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় উপজেলা প্রশাসন আগামী ২৮ এপ্রিলের মধ্যে দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য এলাকায় মাইকিং করেছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে কলমাকান্দা উপজেলায় ২১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই রয়েছে চার হাজার ৬৩০ হেক্টর জমি। কৃষি দপ্তরের দাবি, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত হাওরের প্রায় ৪০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।
তবে মাঠের কৃষকেরা এই দাবির সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের মতে, হাওরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে, বাকি বিশাল অংশের ফসল এখনও মাঠেই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।
ধান কাটার জরুরি মুহূর্তে চরম শ্রমিক ও জ্বালানি সংকট কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। মাঠে বর্তমানে ৩০ থেকে ৩৫টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার কাজ করলেও পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের অভাবে সেগুলোর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বিশরগ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “তিন একর জমিতে ধান করেছি। ধান পেকে গেছে, কিন্তু কাটার জন্য শ্রমিক নেই। জমিতে পানি থাকায় মেশিনও ঢুকতে পারছে না। এক কাটা জমির ধান কাটতে খরচ পড়ছে এক হাজার ৪০০ টাকা, অথচ বাজারে এক মণ ধানের দাম মাত্র ৭০০ টাকা! আমরা কীভাবে বাঁচবো?”
অন্যদিকে হারভেস্টার মালিক আজিজুল হক জ্বালানি সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, “একটি মেশিন সচল রাখতে দিনে দেড়শো লিটার তেল লাগে। আমরা বরাদ্দ পাচ্ছি মাত্র ৮০ লিটার। ফলে বাধ্য হয়ে অর্ধেক সময় মেশিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে জানান, ইতোমধ্যে প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার জন্য সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছি। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন এবং হারভেস্টারগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহারে সমন্বয় করা হচ্ছে। আশা করছি, খুব শিগগির জ্বালানি সংকট কিছুটা কমে আসবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. মিকাইল ইসলাম বলেন, “আগাম বন্যার আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে কৃষকেরা তাদের কষ্টার্জিত ফসল নিরাপদে ঘরে তুলতে পারেন।”
কলমাকান্দার হাওরের বুকজুড়ে এখন কেবলই সময়ের বিরুদ্ধে এক রুদ্ধশ্বাস দৌড়। একদিকে ক্রমাগত বাড়তে থাকা বানের পানি, অন্যদিকে ঘামে ভেজা ক্লান্ত কৃষকের ফসল বাঁচানোর আপ্রাণ লড়াই। প্রতিটি দিন যেন তাদের সামনে নতুন করে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে- শেষ পর্যন্ত কি সব ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে, নাকি বানের জলে ভেসে যাবে কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন?
পড়ুন : মহারাজা কুমুদ চন্দ্র স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ ৬ শূন্য পদে নিয়োগ ও ৬ পদ সৃজনের তাগিদ


