হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগে সক্রিয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি কাউন্সিল। ইরান যদি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও হুমকি বন্ধ না করে, তবে তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের পথ খোলা রাখতে একটি খসড়া প্রস্তাব তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইন। এ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে ইতিমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এ প্রস্তাবকে জাতিসংঘের কার্যকারিতার একটি ‘পরীক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি চীন ও রাশিয়াকে আগের মতো ভেটো না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক জলপথ বন্ধ হয়ে গেলে তা বহু দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে, যা বড় শক্তিগুলোর স্বার্থেরও পরিপন্থী।
খসড়া প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাহরাইন ছাড়াও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছে। এটি পাস হলে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও নতুন খসড়ায় সরাসরি শক্তি প্রয়োগের কথা বলা হয়নি, তবু এটি জাতিসংঘ সনদের অধ্যায় ৭-এর আওতায় আনা হয়েছে, যা নিরাপত্তা পরিষদকে প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা দেয়
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এই কূটনৈতিক তৎপরতার পটভূমি তৈরি করেছে। গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। চার সপ্তাহের নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যেই এই সংঘর্ষ এবং পাল্টাপাল্টি নৌ অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এর আগে বাহরাইনের একটি প্রস্তাব, যা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়েছিল, রাশিয়া ও চীনের ভেটোর কারণে ভেস্তে যায়। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে নতুন খসড়াটি তুলনামূলক সতর্ক ভাষায় তৈরি করা হয়েছে। তবু এতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে নিন্দা জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবে তেহরানকে অবিলম্বে হামলা বন্ধ করা, সমুদ্রে পাতা মাইনের অবস্থান প্রকাশ করা এবং সেগুলো অপসারণে বাধা না দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি মানবিক করিডর গড়ে তুলতে জাতিসংঘের সঙ্গে সহযোগিতা করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে জাতিসংঘ মহাসচিবকে, এরপর পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করবে নিরাপত্তা পরিষদ
কূটনীতিকদের মতে, ওয়াশিংটন দ্রুত আলোচনা শেষ করতে চায় এবং স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভোটাভুটিতে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। তবে রাশিয়া ও চীনের পক্ষ থেকে বিকল্প প্রস্তাব বিবেচনায় থাকায় আলোচনার গতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। চীনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এখনো খসড়াটি মূল্যায়ন করছে, আর রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
জাতিসংঘের এই উদ্যোগ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা তৎপরতার তুলনায় ভিন্ন পথ নির্দেশ করছে। এত দিন ওয়াশিংটন মূলত জাতিসংঘের বাইরে থেকেই সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছিল এবং মিত্রদের নিজস্ব তদারকিতে নৌ টহলে অংশ নিতে চাপ দিচ্ছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত ও আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেক দেশ এতে সায় দেয়নি। এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিত্রদের সমালোচনাও করেন।
সোমবারের উত্তেজনার পর ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি উদ্যোগ চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার লক্ষ্য হরমুজে আটকে পড়া ট্যাংকার ও অন্যান্য জাহাজ সরিয়ে নেয়া। একই সঙ্গে ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট (এমএফসি)’ নামে একটি বহুজাতিক নৌ জোট গঠনের প্রস্তাবও দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুদ্ধ-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করাই এর লক্ষ্য।
এই জোটটি প্রায় ৩০টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত একটি পৃথক ফরাসি-ব্রিটিশ নৌ মিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার কথা রয়েছে। ওই উদ্যোগ মূলত সংঘাত শেষে ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপদ নৌ চলাচলের পথ তৈরির পরিকল্পনা করছে।
তবে সামরিক সম্পদ মোতায়েনের ক্ষেত্রে অনেক দেশই জাতিসংঘের সরাসরি ম্যান্ডেটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এমএফসি স্বাধীনভাবে কাজ করলেও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্যান্য নৌ নিরাপত্তা টাস্কফোর্সের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
পড়ুন:লিমন-বৃষ্টিকে মরণোত্তর পিএইচডি ডিগ্রি দিচ্ছে ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা
দেখুন:লিথিয়াম ছাড়া আমরা অচল কেন
ইমি/


