বিজ্ঞাপন

ইরানকে সহায়তার রাশিয়ার গোপন পরিকল্পনা ফাঁস

ইরানে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কেন পেরে উঠছে না, তার কারণ রয়েছে অনেক। এর একটি হলো ইরানি ড্রোনের কার্যকারিতা। আর এর পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়ার দাবি করেছে দ্য ইকোনমিস্ট। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকীটি বিশ্বস্ত সূত্রে সম্প্রতি একটি গোপনীয় নথি পেয়েছে, যেখানে ইরানকে জ্যাম-প্রতিরোধী ড্রোন সরবরাহ, পারস্য উপসাগরসহ অন্যান্য স্থানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে রাশিয়ার প্রস্তাব ছিল।

এত দিন পর্যন্ত ধারণা করা হতো, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সরকার কেবল গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে সাহায্য করছে। তবে গোপন নথির তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া সম্ভবত ইরানকে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহেরও প্রস্তাব দিয়েছে, যা মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে। এ নথিই তার প্রথম প্রমাণ।

রাশিয়া ইরানকে পাঁচ হাজার স্বল্পপাল্লার ‘ফাইবার-অপটিক’ ড্রোন এবং নির্দিষ্টসংখ্যক দূরপাল্লার স্যাটেলাইট-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন সরবরাহের পাশাপাশি উভয় ধরনের ড্রোন চালনার প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাবের কথা উল্লেখ আছে এই নথিতে। এ ধরনের ড্রোন ইউক্রেনে ব্যবহার করছে রাশিয়া।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউর তৈরি করা ১০ পৃষ্ঠার ওই প্রস্তাব ইরানের কাছে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। ওই প্রস্তাবে ছয়টি ডায়াগ্রাম এবং ইরানের উপকূলীয় দ্বীপপুঞ্জের একটি মানচিত্র রয়েছে। তবে নথিটিতে কোনো তারিখ উল্লেখ করা নেই।

ধারণা করা হচ্ছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর ছয় সপ্তাহের মধ্যেই এটি তৈরি করা হয়েছিল। ওই সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল খারগ দ্বীপ দখলের জন্য স্থল বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিতে পারেন বলে প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল।

তবে নথিটি শেষ পর্যন্ত ইরানের কাছে পৌঁছেছে কি না কিংবা কোনো ড্রোন ইরান পেয়েছে কি না অথবা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে কি না—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

পরিকল্পনাটি সম্পর্কে জানে, এমন আঞ্চলিক গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, তাদের কাছে এটি বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও তারা স্বাধীনভাবে এর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। রুশ গোয়েন্দা সংস্থাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টো গ্রোজেভ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে ইরানকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে সমর্থন বাড়ানোর যে নানা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, এই প্রস্তাব তারই অংশ। এ ছাড়া ওই অঞ্চলে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামরিক সহযোগিতার যে চিত্র ফুটে উঠছে, তার সঙ্গেও এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এর আগে গত মার্চের শেষের দিকে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা দাবি করেন, রাশিয়া দূরপাল্লার শাহেদ ড্রোনের উন্নত সংস্করণ ইরানকে দিতে যাচ্ছে।

রাশিয়া ২০২২ সালে ইরানের কাছ থেকে এই ড্রোন কেনা শুরু করে এবং ২০২৩ সালে নিজেরাই এর উৎপাদন শুরু করে। এই ড্রোনের রুশ সংস্করণগুলো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে আরও বেশি কার্যকর এবং এগুলো বেশি ওজনের মারণাস্ত্র বহন করতে পারে, যদিও এগুলো এর প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।

ফাইবার-অপটিক ড্রোন ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এগুলো দিয়ে খোলা স্থানে থাকা যানবাহন ও সেনাদের ওপর অবিরাম হামলা চালানো হয়। এ ড্রোন বেতার তরঙ্গের পরিবর্তে ফাইবার অপটিক দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এতে বেতার তরঙ্গ জ্যাম হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। এর সাহায্যে দূরে বসেই ড্রোন পরিচালকেরা ৪০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে পারেন।

সম্প্রতি লেবাননে এ ধরনের ড্রোনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যেখান হিজবুল্লাহ এগুলো ব্যবহার করে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছিল। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে এগুলো ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সরবরাহ করেছে। তবে এগুলো মূলত রাশিয়া থেকে এসেছে কি না, সে বিষয়ে তাঁরা কিছু বলতে রাজি হননি।

২০২৪ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে ফাইবার-অপটিক ড্রোনের আবির্ভাব ঘটে মূলত জ্যামারকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল হিসেবে। পরের বছর রাশিয়া এগুলো ব্যাপকভাবে উৎপাদনের পর গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল পায়। এগুলো থেকে অনেক স্বচ্ছ ভিডিও চিত্র পাওয়া যায় এবং শত্রুপক্ষ চালকের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে না।

পরিকল্পনাটির তৃতীয় উপাদান হলো প্রশিক্ষণ। নথিতে রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত আনুমানিক ১০ হাজার ইরানি শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে ড্রোন অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া তাজিক গোষ্ঠী—যারা রুশ এবং পার্সি উভয় ভাষাতেই দক্ষ—এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের অনুগত আলাউয়ি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কেও এ কাজে যুক্ত করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে। তবে প্রস্তাব অনুযায়ী, তাদের সবার আনুগত্য যাচাই করা হবে।

জিআরইউ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নথিটি এমন এক সময়ে লেখা হয়েছিল, যখন ইরানের জন্য প্রধান হুমকি ছিল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া কিংবা খারগ দ্বীপ দখলের লক্ষ্যে আমেরিকার সম্ভাব্য বিমান ও স্থল হামলা। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে মার্কিন ল্যান্ডিং ক্রাফটগুলো তাদের ধীরগতির কারণে ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। একটি ডায়াগ্রামে দেখানো হয়েছে, কীভাবে রুশ-প্রশিক্ষিত ইরানি ড্রোন অপারেটররা ১৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরের গোপন অবস্থান থেকে পাঁচ-ছয়টি ড্রোনের ঝাঁক ছুড়ে নৌযানে আক্রমণ করতে পারে।

তবে বর্তমানে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থল সৈন্য নামানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ; যদিও যুদ্ধের শুরুর দিকে রুশ ও ইরানি কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন।

জিআরইউ-এর নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ পঞ্চম বছরে রাশিয়া বর্তমানে ব্যাপকভাবে ব্যস্ত। ফলে ইরানকে সাহায্য করার জন্য রাশিয়ার সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

প্রস্তাবটিতে আরও সতর্ক করা হয় যে ইরানের যুদ্ধে আরও জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকি রয়েছে। তবে সীমিত সহায়তাও যেকোনো মার্কিন অভিযানকে জটিল করে তুলবে।

নথিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে এই সহায়তা অস্বীকার করার সুযোগ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব হবে।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ইরানের কয়েকটি খালি ট্যাংকারে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন