নতুন করে আলোচনা হচ্ছে ‘হান্টাভাইরাস’ নিয়ে। সম্প্রতি ‘এমভি হনডিয়াস’ নামক একটি ক্রুজ শিপে হান্টাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের খবর এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ এই ভাইরাসটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত আটজন আক্রান্ত এবং তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হান্টাভাইরাস সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের প্রতিবেদনে।
ইউ-এম মেডিকেল স্কুলের মেডিসিন বিভাগের ক্লিনিক্যাল সহযোগী অধ্যাপক এবং ইউ-এম হেলথের একজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এমিলি অ্যাবডোলা জানান, তিনি কখনো ভাবেননি হান্টাভাইরাস নিয়ে কথা বলতে হবে। তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে বিভিন্ন ফোন পাছেন। আর এটার সূত্রপাত সেই জাহাজে আক্তান্তদের শনাক্ত করার পর থেকেই। তিনি বলেন, আমার মনে হয় এখন মানুষ, বিশেষ করে সংক্রামক রোগ নিয়ে খুব সচেতন। বিশেষ করে এমন রোগ, যার নাম হয়তো তারা আগে শোনেনি। আমি জনসেবার অংশ হিসেবে মানুষকে সচেতন এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলছি।
হান্টাভাইরাস কি
ডা. এমিলি অ্যাবডোলা জানান হান্টাভাইরাস হলো একদল ভাইরাসের সমষ্টি যা মূলত ইঁদুর বা রোডেন্ট জাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। বিশ্বের বিভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে হান্টাভাইরাসের বিভিন্ন প্রজাতি দেখা যায়। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ইঁদুরগুলো সাধারণত নিজেরা অসুস্থ হয় না, কিন্তু তারা তাদের শরীর থেকে ভাইরাসের কণা নিঃসরণ করে।
যেভাবে হান্টাভাইরাস মানুষ আক্রান্ত হয়
মানুষ সাধারণত আক্রান্ত ইঁদুরের লালা, মল বা প্রস্রাবের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শে আসলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ উপায় হলো যখন ইঁদুরের শুকিয়ে যাওয়া মল বা প্রস্রাব ধুলোর সঙ্গে মিশে যায় এবং মানুষ শ্বাস নেয়ার সময় সেই দূষিত বাতাস গ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ইঁদুর উপদ্রুত কোনও পুরনো ঘর বা গুদাম পরিষ্কার করার সময় এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
হান্টাভাইরাসের লক্ষণ: হান্টাভাইরাসের লক্ষণসমূহ আক্রান্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভাইরাসের প্রজাতি ভেদে এর লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে:
১. প্রাথমিক লক্ষণ: জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ক্লান্তি, পেটে ব্যথা এবং ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
২. শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা (আমেরিকা অঞ্চল): সংক্রমণ গুরুতর হলে এটি হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিন্ড্রোম তৈরি করে, যার ফলে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং শেষ পর্যন্ত ফুসফুস অকেজো হয়ে যেতে পারে।
৩. কিডনির সমস্যা (ইউরোপ ও এশিয়া অঞ্চল): এই অঞ্চলে এটি হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিন্ড্রোম তৈরি করতে পারে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ রক্তপাত এবং কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাক।
হান্টাভাইরাসের চিকিৎসা: হান্টাভাইরাসের জন্য এখন পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা সুনির্দিষ্ট ওষুধ নেই। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে বেঁচে থাকার হার অনেক বৃদ্ধি পায়। মূলত উপসর্গ অনুযায়ী সহায়তামূলক চিকিৎসা এবং শ্বাসপ্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন সচল রাখার চেষ্টা করা হয়।
ডা. অ্যাবডোলার বলেন, আপনি যদি সদ্য ইঁদুরের মলে ভরা কোনও স্থান শেড পরিষ্কার করে থাকেন বা এমন জায়গায় কাজ করেন যেখানে বন্য ইঁদুরের সংস্পর্শে আসতে হয় তাহলে সাবধান যদি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফ্লু জাতীয় উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসককে জানাবেন। কারণ দ্রুত অক্সিজেন দেয়া ও রক্তচাপ কমে গেলে সহায়ক ব্যবস্তা নেয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়: ইঁদুর উপদ্রুত এলাকা এড়িয়ে চলাই প্রধান উপায়। কোনও সন্দেহজনক জায়গা পরিষ্কার করার সময় শুকনো ঝাড়ু না দিয়ে ব্লিচ মিশ্রিত পানি দিয়ে জায়গাটি ভিজিয়ে নেয়া উচিত যাতে ধুলো না ওড়ে। এছাড়া মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা এবং পরিষ্কার করার পর ভালো করে হাত ধোয়া অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ জনসাধারণের জন্য বর্তমানে এই ভাইরাসের ঝুঁকি অনেক কম, তবে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
সূত্র: ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান ও এনডিটিভি
পড়ুন : দেশেই তৈরি হবে ডেঙ্গু ও হামের টিকা, কমবে অ্যান্টিভেনম সংকট


