যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপ আরও বেড়েছে। একদিনে তার সরকারের চারজন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তবে একই সময়ে দলটির ১১০ জন সংসদ সদস্য নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিরোধিতা করে স্টারমারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
সবশেষ পদত্যাগ করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জুবির আহমেদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পদত্যাগপত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর যুক্তরাজ্যের জনগণ আপনার প্রতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আস্থা সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে, এটি এখন স্পষ্ট।’ জুবির আহমেদের পদত্যাগের আগে দায়িত্ব ছাড়েন কমিউনিটিবিষয়ক মন্ত্রী মিয়াত্তা ফানবুল্লাহ, সুরক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী জেস ফিলিপস এবং মন্ত্রী অ্যালেক্স ডেভিস-জোনস।
দিনের প্রথম পদত্যাগ আসে মিয়াত্তা ফানবুল্লাহর কাছ থেকে। তিনি তার চিঠিতে লেখেন, ‘দেশ পরিবর্তনের দাবি জোরালো হলেও জনগণ বিশ্বাস করে না যে আপনি সেই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারবেন, আমিও করি না।’ এর কয়েক ঘণ্টা পর পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেস ফিলিপস। তিনি স্টারমারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘কথা নয়, কাজে বিশ্বাসী হতে হবে।’
এরপর অ্যালেক্স ডেভিস-জোনস দেশের স্বার্থে পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণা করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান। একের পর এক মন্ত্রীর পদত্যাগে স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠলেও লেবার পার্টির ১১০ জন সংসদ সদস্য যৌথ বিবৃতিতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছেন।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গত সপ্তাহে আমরা অত্যন্ত কঠিন নির্বাচনি ফল দেখেছি। এতে বোঝা যাচ্ছে ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধারে আমাদের সামনে কঠিন কাজ অপেক্ষা করছে। সেই কাজ আজ থেকেই শুরু করতে হবে এবং দেশের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় নয়।’
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ পদত্যাগ করবেন না বলে জানিয়েছে তার দপ্তর। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিনি নিজের দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও এর আগে জানা যায়, মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তিনিও প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি স্টারমারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ আত্মসমালোচনায় কেবল কট্টর ডানপন্থি রিফর্ম পার্টিই লাভবান হবে। ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘স্টারমার প্রায় দুই বছর আগে ব্রিটিশ জনগণের কাছ থেকে পাঁচ বছরের জন্য ম্যান্ডেট পেয়েছেন। তার প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। সহকর্মীদের বলব, একটু থামুন, শান্ত হন।’
এখন পর্যন্ত দলের ভেতরে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারমারের বিরুদ্ধে নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেননি বলেও জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, ‘কেউ সামনে এসে বলেনি যে সে স্টারমারের বিকল্প হতে চায়। যারা বলছেন স্টারমারের সরে যাওয়া উচিত, তাদের বলা উচিত, কে তার চেয়ে ভালো নেতৃত্ব দিতে পারবেন।’
গত সপ্তাহের নির্বাচনে লেবার পার্টির শোচনীয় ফলাফলের কারণে মঙ্গলবার সকালে মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দেন স্টারমার। এই ফলাফল সংসদীয় দলের ভেতরে প্রকাশ্য বিদ্রোহের জন্ম দেয় এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের মধ্যে গভীর বিভাজনকে উন্মোচিত করে। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের এক বিবৃতি অনুসারে, স্টারমার মন্ত্রীদের বলেন ‘আমি গতকাল যেমনটা বলেছি, এই নির্বাচনের ফলাফলের দায় আমি নিচ্ছি এবং আমরা যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও আমি নিচ্ছি।’
গত সপ্তাহের নির্বাচনে লেবার পার্টির জন্য একের পর এক ধাক্কার পর এই চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ওয়েলসে, দলটি সিনেড নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে, অন্যদিকে স্কটল্যান্ডে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি স্কটিশ পার্লামেন্টে টানা পঞ্চমবারের মতো ক্ষমতা ধরে রেখেছে। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং ইংল্যান্ডের ১৩৬টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষজুড়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনগুলো ছিল ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির ভূমিধস বিজয়ের পর সবচেয়ে বড় নির্বাচনি পরীক্ষা।
রিফর্ম ইউকে পার্টিও তাদের সাম্প্রতিক উত্থান অব্যাহত রেখেছে, ১,৪৫০টিরও বেশি কাউন্সিল আসন জিতেছে এবং গত বছরের স্থানীয় নির্বাচনে অর্জিত সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে আরও শক্তিশালী করেছে নিজেদের অবস্থান।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগ নিয়েও চাপে রয়েছেন স্টারমার। মার্কিন ধনকুবের ও যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসার পর লেবার পার্টির যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র: বিবিসি ও আল জাজিরা
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

