বিজ্ঞাপন

উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্যকর্মী মব আতঙ্ক, অভ্যন্তরীণ বৈষম্য এবং হুইপ দুলু’র অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

সম্প্রতি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট জনবল চরম এক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। চিকিৎসায় অবহেলার মিথ্যা ও উস্কানিমূলক অভিযোগে ডা. নাসিরের ওপর বর্বর ও উগ্র নির্মম পিটুনির আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এই বর্বরোচিত ঘটনার পেছনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। অত্যন্ত উদ্বেগজনক এই জাতীয় ঘটনা মূলত হুট করে ঘটে যাওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর উস্কানিমূলক বক্তব্য, আন্ত: ক্যাডার বৈষম্য, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক হয়রানি এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তৈরি হওয়া একটি বিষাক্ত সামাজিক পরিবেশের প্রত্যক্ষ ফল। তদুপরি, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা খাতের বাজেট, জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার জন্য ঢালাওভাবে মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের বলির পাঁঠা বানানোর যে সংস্কৃতি সমাজে জেঁকে বসেছে, তা প্রতিনিয়ত চিকিৎসকদের এরকম প্রাণঘাতী সহিংসতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, ক্ষুদ্র ও কায়েমী স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্দেশ্য প্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক বদলী বন্ধ না হলে চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। সকল কর্মব্যস্ত ও সেবা নিয়োজিত চিকিৎসা পেশাজীবীর জন্য অবিলম্বে একটি নিরাপদ কর্মস্থলের আইনি নিশ্চয়তা দিতে হবে। আমরা এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পক্ষে, যা দৃঢ়ভাবে সমতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং পারস্পরিক পেশাগত শ্রদ্ধা বজায় রাখবে। নীতি নির্ধারক ও সাধারণ নাগরিক উভয় পক্ষকেই এটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি যে, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা কোনো একক পদ বা কেবল চিকিৎসকদের জাদুকরী ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না বরং এটি চতুর্থ শ্রেণী থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পর্যন্ত একটি ধারাবাহিক ও সম্মিলিত চেইন ওয়ার্ক। এর সুফলের জন্য প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, সমন্বিত আধুনিকায়ন ও দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়ন প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির পক্ষে এককভাবে বা রাতারাতি এই বিশাল ও জটিল অবকাঠামো পরিবর্তন করা মোটেও সম্ভব নয়।

​চিকিৎসকদের ঢালাওভাবে দোষারোপ করার এই বৈরী ও ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতির বিপরীতে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেমন ইতিবাচক ও বস্তুনিষ্ঠ আচরণ হওয়া উচিত, তার একটি শক্তিশালী ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত সম্প্রতি আমরা নাটোরে লক্ষ্য করেছি। ৫৯ নাটোর-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ, অ্যাডভোকেট এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু মহোদয় সম্প্রতি নাটোরের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনকালে স্থানীয় একজন সাংবাদিক প্রথাগত ও একপেশে অভিযোগের সুরে বলেন যে, এখানকার চিকিৎসকরা সকাল ১১ টার মধ্যেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন এবং হাসপাতাল থেকে রোগীরা কোনো ভালো সেবা পান না।

​সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা সস্তা জনপ্রিয়তা বা করতালির আশায় চিকিৎসকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বসেন, কিন্তু মাননীয় হুইপ মহোদয় সেখানে এক অনন্য ও দায়িত্বশীল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি সেই একপেশে অভিযোগটি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দেন। বাস্তব সত্য তুলে ধরে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি নিজে হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ ঘুরে দেখেছি, প্রতিটি ওয়ার্ডে রোগীর শয্যা পাশে গিয়ে তাদের সেবার সরাসরি খোঁজ নিয়েছি। একজন রোগীও আমার কাছে চিকিৎসকদের অবহেলা বা অনুপস্থিতির কোনো অভিযোগ করেননি বরং প্রত্যেকেই চিকিৎসকদের আন্তরিকতা ও সেবার বিষয়ে পূর্ণ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে কিছু ঘাটতি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাব লক্ষ্য করে তিনি জানান যে, তিনি নিজে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সাথে কথা বলে দ্রুত তা সমাধানের প্রশাসনিক উদ্যোগ নেবেন।

​মাননীয় হুইপ অ্যাডভোকেট এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু মহোদয়ের এই বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও সহযোগিতাপূর্ণ অবস্থান নাটোর জেলাসহ সমগ্র দেশের চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা ও পরম স্বস্তির সৃষ্টি করেছে।
চিকিৎসকদের ওপর যখন তখন ঢালাও দোষারোপের সস্তা পপুলিজম ও ব্লেম-গেমের সংস্কৃতি ভাঙার ক্ষেত্রে তাঁর এই প্রকাশ্য ও সৎ মূল্যায়ন স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এমন যৌক্তিক ও আশ্বস্তকারী নেতৃত্বই আজ দেশের প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের মনোবল ধরে রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আমরা তাঁর এই অনুকরণীয় ও সাহসী নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও সশ্রদ্ধ সালাম প্রকাশ করছি।

​অথচ, মাঠ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন এমন মানবিক ও ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, তখন স্বাস্থ্য প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কিছু বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত করছে। সম্প্রতি মাননীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী অত্যন্ত দূরদর্শী ঘোষণা দিয়েছেন যে, চিকিৎসকদের নিজ নিজ এলাকায় পদায়ন করা হবে, যেন নিজ এলাকার মানুষ ও মাটির দায়বদ্ধতার কথা ভেবে হলেও তাঁরা আরও ভালোভাবে সেবা দিতে পারেন। মাননীয় মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর দাপ্তরিক চিঠিপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও শুরু হয়, যা চিকিৎসকদের প্রতি অত্যন্ত মানবিক ও যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত।

​কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, ঠিক একই সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিগত কয়েক মাসে অধিদপ্তরের অধীনস্থ ১১-২০ গ্রেডভুক্ত (পূর্বতন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর) জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মচারীদের ব্যাপক হারে অপ্রত্যাশিত বদলি করেছে। এই ধরনের বদলির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বদলি ও পদায়ন নীতিমালার ন্যূনতম নিয়মকানুন আদৌ অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা ভাববার যথেষ্ট নেতিবাচক অবকাশ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি বিশেষ মহল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভুল বুঝিয়ে, নিজেদের ব্যক্তিগত ফায়দা এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থ সিদ্ধি করতে এই মাঠপর্যায়ের টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল কর্মচারীদের অন্যায়ভাবে বলী বানিয়েছে। চিকিৎসকদের জন্য এক নিয়ম আর তাঁদেরই সহযোদ্ধা চিকিৎসা কর্মচারীদের জন্য অন্য নিয়ম, প্রশাসনের এমন দ্বিমুখী ও বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি কোনো ভাবেই কাম্য নয়। এটি স্বাস্থ্য খাতের অভ্যন্তরীণ চেইনকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মব সৃষ্টি করে চিকিৎসকদের রাস্তায় শারীরিকভাবে আক্রমণ করা যেমন গুরুতর অপরাধ ও বেদনাদায়ক, ঠিক তেমনি দপ্তরের ভেতরে বসে ফাইল চালাচালির মাধ্যমে কর্মচারীদের প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করাও সমভাবে নিপীড়নমূলক ও পীড়াদায়ক।

​আমরা ডা. নাসিরের দ্রুত আরোগ্য ও সুস্থতা কামনা করছি এবং তাঁর ওপর বর্বরোচিত হামলাকারী ও পর্দার আড়ালের পরিকল্পনাকারীদের দ্রুততম সময়ে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি, যা ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে যেকোনো চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলার দুঃসাহসকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেবে। একই সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতি আহ্বান, অবিলম্বে জ্যেষ্ঠ কর্মচারীদের এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক বদলি বাতিল করে একটি বৈষম্যহীন ও সুশাসিত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সদয় হউন। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থেই আমরা একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও বৈষম্যহীন কর্মস্থল পাওয়ার অধিকার রাখি এবং এর জোর দাবি জানাচ্ছি।

লেখক:- মুকুল হোসেন
তৃণমূল স্বাস্থ্যকর্মী ও শ্রমিক অধিকার কর্মী।

পড়ুন : রাজশাহীতে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬’ প্রতিযোগিতার উদ্বোধন

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন