রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হয়ে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন মাদারীপুরের সুরুজ কাজী (৩৪)নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন।এদিকে নিহতের মৃত্যুর খবরে বাড়িতে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাকরুদ্ধ হয়েছে পরিবারটি।
শুক্রবার ( ২২ মে) সকালে মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ খাগড়াছড়া সুরুজের বাড়ি গেলে দেখা যায় চলতেছে শোকের মাতম।
গত সোমবার রাশিয়ায় প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি। এই বিষয়টির গতকাল বৃহস্পতিবার স্বজনরা জেনেছেন বলেও জানান তার পরিবার।
নিহত সুরুজ মাদারীপুর সদর উপজেলার দক্ষিণ খাগড়াছড়া এলাকার শাহাবুদ্দিন কাজীর ছেলে। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সুরুজ ছিলেন সবার বড়।
নিহত ব্যক্তির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশি এক দালালের মাধ্যমে ইউরোপ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সুরুজ। অনেক চেষ্টার পরও ইউরোপের ভিসা না পেয়ে এক এজেন্সির মাধ্যমে তিনি রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আট মাস আগে তিনি বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় যান। সেখানে স্বাভাবিক কাজে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশি দালালের খপ্পরে পড়ে তিনি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সম্প্রতি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে নিহত হন সুরুজ। প্রথমে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রাখা হলেও রাশিয়ায় অবস্থানরত দুই বাংলাদেশি প্রবাসী যুবক মুঠোফোনে সুরুজের পরিবারকে বিষয়টি জানান গতকাল।এদিকে সুরুজের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তাঁর বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর ভিড় বাড়তে থাকে। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে বাড়ির চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
এদিকে উপার্জনকারী ছেলেকে হারিয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা শাহাবুদ্দিন কাজী।
কান্না কন্ঠে এ সময় তিনি বলেন, আমার কোন বড় ছেলে নাই এই পোলাই আমার বড় এই পোলাই আমার সব এই পোলারে নিয়াই আমার স্বপ্ন ছিল। আমাগো বৃদ্ধ বয়সে রাখবে ভালো রাখবে। কিন্তু সেই ভালো রাখতে গিয়ে আসবে লাশ হয়ে ফিরবে। এইভাবে যে আমার পোলাটা চইলা যাইবে এ আমি কল্পনা করি নাই কখনো ভাবি নাই এখন তোমরা আমার পোলার লাশ টা আইনা দাও। সরকারের কাছে দাবি, আমার ছেলের লাশটা যেন দেশে এনে দেন এবং আমাদের পরিবারের জন্য সাহায্য সহযোগিতা করেন।’
তিন মাস আগে সুরুজের দুই বছর বয়সী ছেলে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। প্রথমে একমাত্র সন্তান ও পরে স্বামীকে হারিয়ে পাগলপ্রায় স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (২২)। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার তো সব শেষ হয়ে গেছে সব লইয়া গেছে আমার আর কোন স্মৃতি রইলো না আমি কারে আলগায় বাচমু। তোরা আমার স্বামীর লাশটা আইনা দে আমি ওর স্মৃতি লইয়া বাঁচতে চাই। আমার ছেলে নাই স্বামী নাই সব রয়ে গেছে আল্লাহ তুমি এখন আমারে লইয়া যাও।
নিহত সুরজের বন্ধু রুবেল মুন্সী ও আরিফ হাসান সাইফুল ইসলাম রাহান বলেন, সুরজ ছোটবেলা থেকেই অনেক পরিশ্রমী ছিল। সব সময় কাজটাকে ভালবাসত কিন্তু দেশে যে কয় টাকা দিয়ে কামাই করতে কয় টাকা দিয়ে সংসার চলা বড় কষ্ট দায়। একটু ভালো থাকার জন্য সংসারের হালটাকে পরিপূর্ণভাবে ধরতে গিয়ে সুরুজ আজ নিহত হয়েছে। তার এমন মৃত্যু আমরা কোনোভাবেই মানতে পারছি না। আমরা তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।’
মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মাদারীপুরের এক যুবকের মৃত্যুর খবর স্বজনদের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি। তিনি কীভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন, সে তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে তাঁর পরিবার এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ দায়ের করলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াদিয়া শাবাব বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে লাশ দেশে আনার জন্য সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়া শোকাহত পরিবারটির পাশে উপজেলা প্রশাসন সব সময় থাকবে।
পড়ুন- মন্ত্রিসভার ৭ বৈঠকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ৭০ শতাংশের বেশি


