উপমহাদেশের মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ সমাগত। আনন্দ, উৎসব আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই বিশেষ দিনটি উদযাপিত হয়। তবে অন্যান্য সাধারণ উৎসবের তুলনায় কোরবানির ঈদের একটি মৌলিক ও কাঠামোগত তফাৎ রয়েছে। এই উৎসবের মূল অনুষঙ্গই হলো পশু কোরবানি করা এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে তার মাংস আত্মীয়-স্বজন, দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে খাওয়া। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই সময়ে প্রতি ঘরে ঘরে মাংসের এক বিশাল প্রাচুর্য তৈরি হয় এবং দৈনিক খাদ্যতালিকায় মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবারের আধিক্য দেখা যায়। উৎসবের এই আনন্দঘন পরিবেশে অনেকেই অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিমিত খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, যা প্রত্যাহিক স্বাভাবিক খাবারের তুলনায় পরিমাণে অনেক বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, অনিয়ন্ত্রিত ভোজন সাময়িক তৃপ্তি দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক কষ্টের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক রোগে ভুগছেন, তাদের জন্য এই সময়ে সামান্য অসতর্কতা উৎসবের আনন্দকে বিষাদে রূপান্তর করতে পারে। তাই কোরবানির ঈদ যেন কোনোভাবেই উৎসবের বদলে কান্নার কারণ না হয়, সেজন্য খাদ্যাভ্যাসে পরিমিতিবোধ এবং বিশেষ স্বাস্থ্য সচেতনতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
গরু, মহিষ বা খাসির মাংস, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘রেড মিট’ বা লাল মাংস নামে পরিচিত, তা উচ্চমানের প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক এবং ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের একটি চমৎকার উৎস হলেও অতিরিক্ত গ্রহণে এর কিছু মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। লাল মাংসে প্রচুর পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা সম্পৃক্ত চর্বি এবং কোলেস্টেরল থাকে, যা রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল (LDL)-এর মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে রক্তনালীর দেয়ালে চর্বি জমে তা সরু হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া অতিরিক্ত মাংস থেকে উৎপন্ন ইউরিক এসিড শরীরে গেঁটে বাত বা জয়েন্টে ব্যথার সৃষ্টি করে এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে। কোরবানির ঈদে যত্রতত্র মাংস খাওয়ার প্রবণতা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে। যেমন, হৃদরোগী এবং যারা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত চর্বি ও মশলা দিয়ে রান্না করা মাংস রক্তচাপ হঠাৎ বাড়িয়ে দিয়ে স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি করে। অন্যদিকে, মাংস সরাসরি রক্তে শর্বরা না বাড়ালেও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে দেয়, যা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত করে তোলে। একইভাবে, চর্মরোগী, বিশেষ করে যারা ক্রনিক একজিমা বা সোরিয়াসিসে ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাংস এবং মাংস রান্নায় ব্যবহৃত গরম মশলা তীব্র অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন তৈরি করতে পারে।
কোরবানির ঈদে সাধারণত হৃদরোগ বা ডায়াবেটিস নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও, শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের (অ্যাজমা, সিওপিডি বা দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্ট) ঝুঁকির বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়, অথচ এই সময়ে তাদের সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ঈদের দিনে অতিরিক্ত বা পেটপুরে মাংস ও ভারী খাবার খেলে পেট ফেঁপে যায় বা তীব্র গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হয়। পাকস্থলী যখন অতিরিক্ত পূর্ণ হয়ে যায়, তখন তা ফুসফুসের নিচের পর্দা বা ডায়াফ্রামের (মধ্যচ্ছদা) ওপর ওপরের দিকে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হতে পারে না এবং অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রে তীব্র শ্বাসকষ্টের ট্রিগার হিসেবে কাজ করে। এছাড়া, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও মশলাদার খাবার খেলে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স (GERD) বা এসিডিটি বৃদ্ধি পায়, এবং পাকস্থলীর এই এসিড যখন খাদ্যনালী বেয়ে ওপরের দিকে ওঠে, তখন তা শ্বাসনালীতে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে শ্বাসনালীকে সংকুচিত করে দেয়, যা আকস্মিক অ্যাজমা অ্যাটাকের কারণ হয়। এর পাশাপাশি মাংস কাটার সময় পশুর লোম, রক্ত বা বর্জ্যের গন্ধ এবং পরবর্তীতে মাংস বার্বিকিউ বা কয়লার আগুনে পোড়ানোর ধোঁয়া সরাসরি শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে শ্বাসনালীতে তীব্র প্রদাহ তৈরি করে। তাই শ্বাসতন্ত্রের রোগীদের ঈদের দিনগুলোতে কখনোই পেট সম্পূর্ণ ভর্তি করে খাওয়া উচিত নয়। খাবার সবসময় অল্প অল্প করে বারবার খেতে হবে এবং ধোঁয়া ও ধুলোবালি থেকে দূরে থাকতে সর্বদা মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
উৎসবের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করার পাশাপাশি শরীরকে সুস্থ রাখতে খাদ্যাভ্যাসে কিছু ব্যবহারিক পরিবর্তন ও পরিমিতিবোধ আনা একান্ত প্রয়োজন। মাংস কাটার সময়ই দৃশ্যমান চর্বিগুলো সম্পূর্ণ কেটে বাদ দিতে হবে এবং রান্নার আগে কিছুক্ষণ গরম পানিতে ফুটিয়ে পানি ফেলে দিলে চর্বির পরিমাণ অনেক কমে যায়। অতিরিক্ত তেল, ঘি বা গরম মশলা দিয়ে ভুনা করার চেয়ে মাংস বেক করে, স্টু করে বা কম তেলে ঝোল করে রান্না করা স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ। মাংসের চর্বি যেন শরীরে সহজে শোষিত হতে না পারে, সেজন্য খাবারের পাতে মাংসের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে শসা, লেবু, টমেটোর সালাদ এবং আঁশযুক্ত সবজি রাখা উচিত। মাংস হজম হতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয় বিধায় সারাদিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার পানি বা তরল খাবার গ্রহণ করা উচিত, তবে খাওয়ার ঠিক পরপরই অতিরিক্ত পানি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে রাতে ভারী খাবার খাওয়ার অন্তত ২ ঘণ্টা পর ঘুমাতে যাওয়া উচিত, কারণ খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে এসিডিটি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা বহুগুণ বেড়ে যায়। কোরবানির মূল দর্শনই হলো আত্মত্যাগ এবং সংযম, যা কেবল পশু উৎসর্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। উৎসবের ক্ষণস্থায়ী আমেজে ভেসে গিয়ে নিজের বা পরিবারের অসুস্থ স্বজনদের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়; খাবারের পাতে পরিমিতিবোধ, রান্নায় সচেতনতা এবং অসুস্থদের প্রতি বিশেষ যত্নই পারে এই উৎসবকে সবার জন্য নিরাপদ ও আনন্দময় করে তুলতে।
লেখক : মুকুল হোসেন, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর্মী, ফোকাল পয়েন্ট, চেস্ট ডিজিস ক্লিনিক, নাটোর।
পড়ুন : ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে তীব্র যানজটে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ চরমে


