দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, তখন কিছুটা স্বস্তির খোঁজে কালিয়াকৈরের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র, পার্ক ও রিসোর্টের ওয়াটারফ্রন্ট এবং সুইমিং পুলে ভিড় করছেন হাজারো মানুষ।
প্রচণ্ড গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়া থেকে মুক্তি পেতে শিশু, কিশোর, তরুণ ও বয়স্কসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটে আসছেন এসব বিনোদন কেন্দ্রে।
সোমবার (১ জুন) সকালে সরেজমিনে চন্দ্রা, মৌচাক, সফিপুর ও মধ্যপাড়া এলাকার বিভিন্ন রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সুইমিং পুলগুলোতে পানিতে নামার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে দেখা যায় দর্শনার্থীদের। অনেক পুলে ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মানুষ একসঙ্গে গোসল করছেন।
দেখা গেছে, একটি রিসোর্টের কৃত্রিম পুলে শত শত মানুষ গাদাগাদি করে পানিতে অবস্থান করছেন। পুলের চারপাশের ছাউনিগুলোও ছিল দর্শনার্থীতে পরিপূর্ণ। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এসে পানিতে নেমে গরমের কষ্ট ভুলতে চেষ্টা করছেন।
মৌচাক এলাকার বাসিন্দা হোসেন বলেন, “দুই দিন ধরে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্যান চললেও গরম কমছে না। বাচ্চারাও অস্থির হয়ে উঠেছে। তাই তাদের নিয়ে পুলে এসেছি। কিছুক্ষণ পানিতে থাকার পর অনেকটাই স্বস্তি লাগছে।”
মৌচাক এলাকার গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, “প্রচণ্ড গরমে বাসায় থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাই সন্তানদের নিয়ে এখানে এসেছি। তবে পুলে অতিরিক্ত ভিড় থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা উদ্বেগও রয়েছে। কর্তৃপক্ষের আরও নজরদারি দরকার।”
হঠাৎ দর্শনার্থীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেক বিনোদন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা হিমশিম খাচ্ছে। অধিকাংশ পুলে নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি মানুষ গোসল করায় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি রিসোর্টের এক কর্মী বলেন, “গরমের কারণে প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার মানুষ আসছেন। আমাদের সীমিত জনবল নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। মাইকিং করে সতর্ক করা হলেও অনেকেই নির্দেশনা মানছেন না।”
একটি রয়েল রিসোর্টের ব্যবস্থাপক আশিক বলেন, “দর্শনার্থীর সংখ্যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ, লাইফগার্ড মোতায়েন, পুলের পানি নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা নিয়েছি।”
অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক স্থানে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নেই। সাঁতার না জানা শিশু-কিশোররাও গভীর পানিতে নেমে পড়ছে, যা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টি এস ও (মেডিকেল অফিসার) ডা. সাদিয়া তাজমিন বলেন, “অতিরিক্ত ভিড়যুক্ত পুলে গোসল করলে চর্মরোগ, ফাঙ্গাল সংক্রমণ ও চোখের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। গোসলের আগে ও পরে সাবান ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা জরুরি। শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে।”
গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. আরেফিন বলেন, “বর্তমানে তীব্র তাপপ্রবাহের অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সবুজায়নের অভাব। এ পরিস্থিতিতে সবাইকে অপ্রয়োজনীয় বাইরে চলাফেরা কমানো, বেশি বেশি পানি পান করা এবং পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বিনোদন কেন্দ্রগুলোকে স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কোনো ধরনের দুর্ঘটনা বা স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি না হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি উদ্যোগে উন্মুক্ত সুইমিং পুল, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ও পর্যাপ্ত লাইফগার্ড নিয়োগেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, “তীব্র তাপপ্রবাহে জনসাধারণের কষ্ট লাঘবে উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।”
তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় আগামী কয়েক দিনেও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত না হলে আনন্দময় এই অবকাশ যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পড়ুন : সিরাজগঞ্জে মাসব্যাপী লোকজ সাংস্কৃতিক উৎসব ও গ্রামীণ পণ্য মেলার উদ্বোধন


