বিজ্ঞাপন

আপনার বিদ্যুৎ বিল কত বাড়বে, হিসাব করে দেখুন

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই চাপে রয়েছে অনেক পরিবার। এর মধ্যে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ায় অনেকেই ভাবছেন, এ মাসে তার বিদ্যুৎ বিল কত আসবে? তবে এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে, আপনার বাসায় প্রতি মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।

কারণ বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণ করা হয় মূলত এই ইউনিটের ওপর ভিত্তি করে। এবং অন্যদিকে, আবাসিকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের বাড়তি দাম প্রত্যাহার করেছে সরকার।

বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো ‘ইউনিট’।

সহজভাবে বলতে গেলে, এক ইউনিট বিদ্যুৎ মানে ঘণ্টায় এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার।

অর্থাৎ, আপনার বাসায় যদি এক হাজার ওয়াট ক্ষমতার কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র এক ঘণ্টা চলে, তাহলে সেটি এক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ করবে। একইভাবে, ১০০ ওয়াটের একটি বাল্ব ১০ ঘণ্টা জ্বললে কিংবা ৫০ ওয়াটের একটি ফ্যান ২০ ঘণ্টা চললেও সমপরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো এই ইউনিটের হিসাবের ভিত্তিতে গ্রাহকের বিল নির্ধারণ করে থাকে।

আপনি কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, তা জানতে হলে প্রথমে মিটারের রিডিং বুঝতে হবে।

বিদ্যুৎ মিটারের ডিসপ্লেতে মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ কিলোওয়াট-ঘণ্টা হিসেবে দেখানো হয়। নতুন মিটার বসানো হলে শুরুতে রিডিং সাধারণত শূন্য থাকার কথা।

কিন্তু ওই মিটার যেহেতু সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে পরীক্ষা করতে হয়, তখন তাতে ১৫-২০ ইউনিট উঠে যেতে পারে। আবার অনেকসময় মিটার এক জায়গা থেকে এনে অন্য জায়গায় লাগাতে হয়।

তখন হয়তো কারও বাড়ির মিটারের রিডিং শুরুই হয় ১০ হাজার থেকে। কিন্তু এতে সমস্যা নেই।

যত বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে, মিটারের সংখ্যা তত বাড়তে থাকবে। আর মাস শেষে বর্তমান রিডিং থেকে আগের রিডিং বাদ দিয়ে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার বা ইউনিট নির্ধারণ করা হয়।

উদাহরণস্বরূপ, যদি গত মাসে মিটারের রিডিং ১২ হাজার ২০০ ইউনিট থাকে এবং বর্তমানে তা ১২ হাজার ৫০০ ইউনিট দেখায়, তাহলে ওই সময়ে ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ ৩০০ ইউনিট।

মূলত, গাড়ির ওডোমিটার যেমন গাড়িটি তৈরি হওয়ার পর থেকে কত কিলোমিটার চলেছে তার হিসাব রাখে, বিদ্যুৎ মিটারও তেমনি মোট কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে, তার হিসাব রাখে।

তবে ঠিক কত টাকা বিল আসবে, শুধু মিটার দেখে তা সবসময় নির্ভুলভাবে বলা যায় না। কারণ ইউনিটের খরচ ছাড়াও বিলে মিটার ভাড়া, ভ্যাট বা অন্যান্য নির্ধারিত চার্জ যুক্ত থাকতে পারে।

যদিও সরকার বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক ঊর্ধতন কর্মকর্তা।

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণার এক দিনের মাথায় আবার দাম পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

প্রান্তিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের নতুন খুচরা মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছিলো বিদ্যুৎ বিভাগ। তার প্রেক্ষিতে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে বাড়তি বিলের চাপ থেকে রেহাই দিতে দুই শ্রেণির গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিইআরসি জানিয়েছে, আবাসিক লাইফ লাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং আবাসিক প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না হয়ে পূর্বের মূল্যহার বহাল থাকবে।

অর্থাৎ, লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি আগের চার টাকা ৬৩ পয়সাই থাকবে। শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিটের মূল্যও আগেরটি থাকবে, পাঁচ টাকা ২৬ পয়সা।

বাকী ধাপগুলোর দাম তেসরা জুন বিইআরসি ঘোষিত নতুন মূল্যহার অনুযায়ী-ই থাকবে।

এছাড়া, ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিটের ক্ষেত্রে দাম হবে আট টাকা ৫০ পয়সা। ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য এই হার নয় টাকা ৫৯ পয়সা।

৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে নয় টাকা ৬২। ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের গুণতে হবে ১৫ টাকা ১ পয়সা।

আর যেসব গ্রাহক মাসে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা।

ধরা যাক, এতদিন আপনার মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকা আসতো।

কিন্তু বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, আপনার বর্তমান বিল কতটা বাড়বে, তা জানতে হলে প্রথমে দেখতে হবে আপনার মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহার কত ইউনিট।

কারণ সবার বিল সমান হারে বাড়বে না। যে গ্রাহক যত বেশি ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও তত বেশি হতে পারে।

এটি জানতে মিটারের বর্তমান রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, আপনি এ মাসে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন।

তাহলে আপনার বিলের একটি অংশ ৭৬-২০০ ইউনিটের স্ল্যাবে, আরেকটি অংশ ২০১-৩০০ ইউনিটের স্ল্যাবে হিসাব করা হবে। অর্থাৎ, আপনার বিল একাধিক স্ল্যাবের হারে গণনা করা হবে।

আরও সহজভাবে বললে, প্রথম ৭৫ ইউনিটের বিল প্রথম স্ল্যাবের হারে, পরবর্তী ১২৫ ইউনিটের বিল দ্বিতীয় স্ল্যাবের হারে এবং শেষ ১০০ ইউনিটের বিল তৃতীয় স্ল্যাবের হারে গণনা করা হবে। অর্থাৎ, পুরো ৩০০ ইউনিটের জন্য একই মূল্য প্রযোজ্য হবে না।

এ বিষয়ে বিইআরসি’র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “যখন-ই ৭৫ ইউনিট ক্রস করবে, তখন-ই মাল্টিপল স্ল্যাবে বিল গণনা করা হবে।”

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, আগে কারও বিল যদি দুই হাজার টাকা হলে নতুন নিয়মে সেই বিল হয়তো আড়াই হাজার টাকার মতো আসবে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উপরে যত যাবে, দামও তত বাড়বে। কিন্তু এটা ঐকিক নিয়মের মতো বাড়বে। যে ধাপে যত শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেই অনুযায়ী বাড়বে।

আবার, কেউ ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে তার বিল হয়তো আগে এক হাজার টাকা আসতো। কিন্তু এখন প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে তা হয়তো এক হাজার ২০০ টাকা হতে পারে বলে মত তার।

বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখার জন্য বাংলাদেশে মূলত দুই ধরনের মিটার ব্যবহার করা হয়।

প্রিপেইড, পোস্টপেইড; এই দুই ব্যবস্থার মূল পার্থক্য হলো টাকা পরিশোধের পদ্ধতিতে।

পোস্টপেইড মিটারের ক্ষেত্রে গ্রাহক প্রথমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, পরে মাস শেষে বিল পরিশোধ করেন। বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা নির্দিষ্ট সময় পর মিটারের রিডিং নিয়ে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ করে বিল তৈরি করে। গ্রাহককে সেই বিল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়।

অন্যদিকে, প্রিপেইড মিটারে আগে টাকা রিচার্জ করতে হয়, তারপর সেই টাকার বিপরীতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। মিটারের ডিসপ্লেতে সাধারণত অবশিষ্ট ব্যালেন্স, ব্যবহৃত ইউনিট এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দেখা যায়। ব্যালেন্স কমে এলে মিটার সতর্কবার্তাও দিতে পারে।

তবে মিটারের ধরন যাই হোক, ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণের ভিত্তিতেই বিল নির্ধারিত হয়।

“মানুষ মনে করে, প্রিপেইডে বেশি টাকা নিচ্ছে, বিষয়টা এরকম না। প্রিপেইডে যখন রিচার্জ করে, তখন আগেই ভ্যাট কেটে নেয়। আর পোস্টপেইডে মাস শেষে ব্যাংকে জমা দেয়। আর প্রিপেইডে মিটার চার্জ ছিল, কিন্তু সেটিও মাইনাস করা হচ্ছে,” বলছিলেন ওই কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : আবাসিকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের বাড়তি দাম প্রত্যাহার

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন