রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার মামলায় রায়ের জন্য আজ (রোববার) ধার্য রয়েছে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত এ রায় ঘোষণা করবেন।
গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের এ দিন ধার্য করেন। এর মধ্য দিয়ে নৃশংস এ ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় নজিরবিহীন গতিতে বিচার শেষ পর্যায়ে পৌঁছাল। মামলা দায়েরের পর ৪ দিনের মাথায় চার্জশিট দাখিল, অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্যগ্রহণ সব ক্ষেত্রেই ছিল দ্রুতগতি। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় এত দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে যাওয়ার নজির দেশে খুব কমই দেখা গেছে। সাধারণত তদন্ত প্রতিবেদন, বিচার শুরু ও সাক্ষ্যগ্রহণের বিভিন্ন ধাপ পার হতে বছরের পর বছর লেগে যায়।
১৯ মে সকালে পল্লবীতে ঘটনাটি ঘটে। পরদিন ২০ মে (১৯ মে দিবাগত রাত) ১২ টা ৫ মিনিটে ভিকটিমের বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে ভিকটিমকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানো ও লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। এরপর তদন্তে মাঠে নামে পুলিশ। ঘটনার ৪ দিনের মাথায় ২৪ মে তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেন। চার্জশিটে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়। ওইদিনও মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হলে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চার্জশিট আমলে নেন। অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য ১ জুন ধার্য করেন। ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন আসামি সোহেল রানা ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২ জুন চার্জশিটভূক্ত ১৮ সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের জবানবন্দি ও জেরার পর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। পরদিন বুধবার (৩ জুন) আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি হয়। সেদিন শুনানিতে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। দুই আসামির বক্তব্য রেকর্ড শেষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য বৃহস্পতিবার ধার্য করেন আদালত।
রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি আজিজুর রহমান দুলু যুক্তি উপস্থাপন করেন। এসময় সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যায়ক্রমে পড়ে শোনান তিনি এবং আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন। অপরদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ যুক্তি উপস্থাপন করেন। শুনানিতে তিনি আসামি সোহেল রানার সর্বনিম্ন শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রার্থনা। অপর আসামি স্বপ্নার শুধুমাত্র লাশ গুম চেষ্টায় সহযোগিতার আপরাধের শাস্তি চান। পরে আদালত রায় ঘোষণার জন্য রোববার ধার্য করেন।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই শিশুটির সাথে যা হয়েছে এর বর্ণনা শুনে পুরো দেশের মানুষ স্তব্ধ। এ নৃশংস ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এটা সবার চাওয়া। যারা সাক্ষী দিয়েছে তারা ঘটনার ভয়াবহ বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার আপ্লূত হয়েছেন। আদালতে ও এজলাসের বাইরে উপস্থিত সকলেই এই নৃশংসতার বর্ণনা শুনে অঝোরে কেঁদেছেন।
প্রসিকিউটর ফারুকী বলেন, এটা একটা চাঞ্চল্যকর মামলা। আমি মনে করি সরকার এখানে যথেষ্ট আন্তরিক। ঘটনার পরপরই আসামিদের গ্রেপ্তার, আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা ও পরবর্তীতে বিচার শুরু প্রক্রিয়া যৌক্তিকভাবে দ্রুততম সময়ে হয়েছে। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর প্রথম দিনেই সমাপ্ত করা গেছে। এখানে আদালতের আন্তরিকতা, সাক্ষীদের স্ব-প্রণোদিত অংশগ্রহণ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। আশা করছি আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হবে। দেশের মানুষ ন্যায়বিচার চায়, বিচার ব্যবস্থায় আস্থা রাখতে চায়। দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত হলে সমাজে এমন ঘৃণ্য অপরাধ প্রবণতা কমে আসবে।
মামলার সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেয়। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। ডাকাডাকির পর কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়নগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয় পুলিশ।
পড়ুন : ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল বন্ধ বেআইনি: শিশির মনির


