ভারতের নতুন প্রজন্মের ডিজিটাল রাজনীতির ভাষা বদলে দেওয়া তরুণ মুখ হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন অভিজিৎ দীপকে। ব্যঙ্গ, মিম এবং অনলাইন ন্যারেটিভকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক অভিব্যক্তির এক নতুন ধারা তৈরি করছেন তিনি-যা ইতোমধ্যেই তাকে ভারতের জেন-জি ডিজিটাল সংস্কৃতির অন্যতম আলোচিত চরিত্রে পরিণত করেছে।
পুনেতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা অভিজিৎ দীপকে ৩০ বছর বয়সী একজন তরুণ, যিনি সাংবাদিকতায় স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে পাবলিক রিলেশনস বিষয়ে স্নাতকোত্তর অধ্যয়ন করছেন। তার একাডেমিক ও পেশাগত যাত্রা মূলত ঘুরে বেড়িয়েছে রাজনৈতিক যোগাযোগ, ডিজিটাল মিডিয়া এবং অনলাইন স্টোরিটেলিংয়ের জগতে, যেখানে তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ভিজ্যুয়াল ও ডিজিটাল ভাষা তৈরি করেছেন।
শনিবার দিল্লির যন্তরমন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ কর্মসূচিতে প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক বক্তব্য উপস্থাপনের নতুন ফরম্যাট তৈরির চেষ্টা এবং তরুণদের অনলাইন অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তার কাজ তাকে সমসাময়িক ভারতের অনলাইন অ্যাকটিভিজমের একটি পরিচিত নাম হিসেবে সামনে এনেছে।
২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অভিজিৎ দীপকে আম আদমি পার্টির (আপ) সোশ্যাল মিডিয়া টিমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের সময় তিনি মূলত মিম-ভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন, যা তরুণ ভোটারদের মধ্যে অনলাইন রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন ধারা তৈরি করে। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাকে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও ডিজিটাল ন্যারেটিভ তৈরির দিকে আরও আগ্রহী করে তোলে।
তারই ধারাবাহিকতায় তৈরি হয় ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। এটি কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক দল নয়, বরং একটি ডিজিটাল ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন, যা মিম, সামাজিক মন্তব্য এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গের মাধ্যমে দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মটি কোটি মানুষের দৃষ্টি কাড়ে এবং ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখে পৌঁছায়, যা ভারতের অনেক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের অনলাইন উপস্থিতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সম্প্রতি এই অনলাইন আন্দোলনটি বাস্তব রাজপথেও প্রতিফলিত হয়। গতকাল দিল্লির যন্তর-মন্তরে সিজেপির প্রথম বড় জমায়েত ও প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে তরুণ সমর্থকরা বেকারত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সামাজিক হতাশার মতো বিভিন্ন ইস্যুতে অংশ নেন। আয়োজকদের মতে, এটি ছিল কেবল একটি প্রতীকী সূচনা, ভবিষ্যতে আরও ধারাবাহিক কর্মসূচি আসবে।
আজ অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত আকারে চালানো হবে। তার এই পোস্ট নতুন করে অনলাইন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে থাকা অভিজিৎ দীপকের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ মূলত নিজেদের পরিচয় দেয় ‘সিস্টেমের দ্বারা উপেক্ষিত মানুষের কণ্ঠস্বর’ হিসেবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি এমন একটি অনলাইন স্পেস যেখানে বেকার, হতাশ ও ক্ষুব্ধ তরুণরা ব্যঙ্গ ও মিমের মাধ্যমে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে।
প্ল্যাটফর্মটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় মূলত এর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, মিম সংস্কৃতি এবং তরুণদের বাস্তব সমস্যার প্রতিফলনের কারণে। বেকারত্ব, শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক অসন্তোষের মতো বিষয়গুলো তারা গ্রাফিক ও অ্যানিমেশনের মাধ্যমে উপস্থাপন করে, যা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিজিৎ দীপকে এখন শুধুই একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর নন, বরং তিনি ভারতের নতুন প্রজন্মের এমন এক ডিজিটাল ন্যারেটিভ নির্মাতা, যিনি অনলাইন ব্যঙ্গকে বাস্তব রাজনৈতিক উপস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে এই ধরনের ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন ডিজিটাল রাজনীতির সীমারেখা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে।
সব মিলিয়ে ভিজিৎ দীপকে এখন দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন ধরণের চরিত্র হিসেবে উঠে আসছেন-যেখানে রাজনীতি, ব্যঙ্গ এবং অনলাইন সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
পড়ুন:তোফায়েলসহ ১৬ জন সাবেক এমপি-মন্ত্রীর মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রস্তাব
দেখুন:আঙুর চাষে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন মোকছেদুলের |
ইমি/


