গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের উপর নির্ভরতা দিন দিন কমছে। রোগীর স্বজনেরাও এগিয়ে আসছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। আগের তুলনায় কমেছে রক্ত কেনা-বেচা। তবে প্রয়োজনীয় রক্তের চাহিদা মেটাতে এখনো আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। এজন্যে নতুন রক্তদাতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই। আসলে রক্তদানের জন্যে দাতার ঐকান্তিক ইচ্ছাই যথেষ্ট। ধর্মীয়ভাবেও এ দান অত্যন্ত পূণ্যের কাজ। আর সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে রক্তচাহিদা পূরণে সঙ্ঘবদ্ধ সচেতনতাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। একটি জনগোষ্ঠীর অল্প কিছু অংশ সামর্থ্যবান মানুষ যদি নিয়মিত রক্তদান করেন তাহলেই রক্তের অভাবে কোনো মানুষের মৃত্যু হয় না। নিয়মিত ছোট্ট এই দান নতুন করে হাসি ফোটাতে পারে লাখো মানুষের জীবনে।
আমাদের দেশে বছরে রক্তের চাহিদা আনুমানিক ১০ লাখ ইউনিট। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় রক্তের এ চাহিদা একেবারেই নগণ্য। রক্তের প্রয়োজন মেটাতে যেহেতু কেবল রক্তই দিতে হয়; সেহেতু ব্যাপক জনসচেতনতার মাধ্যমে স্বেচ্ছা রক্তদাতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই রক্তের এ চাহিদা মেটানো সম্ভব।
সরকারি-বেসরকারি নানা আয়োজনের পাশাপাশি আমাদের দেশে সন্ধানী, কোয়ান্টাম, বাঁধন, রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সংগঠন আন্তরিকভাবে রক্ত সংকট পূরণে দিন-রাত চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এ মিছিলে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন দাতা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এখন অনেকটাই সচেতন ভূমিকা পালন করছে।
যারা এখনো মহৎ মানবিক এ মিছিলে যুক্ত হননি; তাদের প্রতি আহ্বান, জীবনে শুধু ছোট্ট একটি সিদ্ধান্ত নিন, আপনি নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতা হবেন। আর যুক্ত হবেন মানবিক বিশাল এক আন্দোলনে। শারীরিকভাবে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যারা আগে কখনো রক্ত দেন নি, তারা শুধু একবার হলেও ঢাকার শান্তিনগরে কোয়ান্টাম ল্যাবে ঘুরে আসতে পারেন। দেখবেন যে, প্রিয়জনের জীবন বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজনে কীভাবে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। কারণ রক্তের বিকল্প শুধু রক্তই।
কোয়ান্টাম ল্যাব থেকে রক্ত পেয়ে একজন রক্তগ্রহীতা একটি প্রােগ্রামে বলছিলেন, ‘আমরা কার রক্ত নিচ্ছি তাকে তো দেখতে পাই না। তার নাম হয়তো স্লিপে থাকে। তার জন্যে আমরা আমাদের পুরো পরিবার দোয়া করতে থাকি।’ এভাবেই স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের প্রতি নিয়মিত রক্তগ্রহীতাদের আহ্বান থাকে সবসময়ই: ‘আপনারা দয়া করে রক্তদান বন্ধ করবেন না। আপনারা রক্ত দিচ্ছেন বলেই আমরা বেঁচে আছি।’
তাই যারা এখনো মানবিক এই মিছিলে যুক্ত হননি তাদের প্রতি আহ্বান, সুস্থ সক্ষম হলে রক্ত দিন। আজই শুরু করুন। যাদের বয়স এখনো ১৮-র কম, তারা ১৯ তম জন্মদিনটি স্মরণীয় করে রাখতে পারেন প্রথম রক্তদানের মাধ্যমে।
আমরা যদি সকল ভয় কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে নিয়মিত রক্তদান করি তাহলে বাংলাদেশের আর কোনো শিশু, বৃদ্ধ, কোনো প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষ রক্তের অভাবে আমাদের কাছ থেকে বিদায় নেবে না। অনেক সময় আমাদের মনে হতে পারে যে, আমি একা রক্ত দিলে কী হবে? আপনি যখন একা করবেন আপনাকে করতে দেখে আরেকজন অনুপ্রাণিত হবেন, তাকে দেখে আরেকজন অনুপ্রাণিত হবেন। সবাই মিলে রক্তের যে চাহিদা এই চাহিদাটা পূরণ করতে পারব।
১৮ কোটি মানুষের এই দেশে যারা রক্ত দিয়েছি ভাষার জন্যে, যারা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেই দেশের মানুষ রক্তের অভাবে মারা যাবে এটি হতে পারে না। আপনার ছোট্ট একটা সিদ্ধান্তই পারে দেশে রক্ত সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা পালন করতে। পুরনোরা তো আছেনই, নতুন যারা স্বেচ্ছা রক্তদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; বিশ্ব রক্তদাতা দিবসে তাদেরকে জানাই অগ্রিম অভিনন্দন।
লেখক: মুনিমা সুলতানা
সাংবাদিক ও সমাজকর্মী
পড়ুন: ড্র নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু ব্রাজিলের
আর/


