পাথরঘাটায় ঢাকা বরিশালের নামি-দামি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নামের সাথে নাম মিলরেখে গড়ে ওঠছে ব্যাঙের ছাতার মতো অবৈধ অগনিত
ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ডাক্তারদের নাম ও ছবি সম্বলিত পোস্টার ফেস্টুন ও ব্যানার ক্লিনিকগুলোতেব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ধোকা দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পাথরঘাটার মানহীন অসংখ্য ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
অসাধু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এই চক্রটি সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে তাদের অপরাধের বিরুদ্ধে যারা প্রতিবাদ করতে পারে এমন ব্যক্তিদেরকে টার্গেট করে চক্রটি ওই সকল মানুষদেরকে হাত করে তাদের ব্যবসার সাথে জড়িত করে চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারণার ফাঁদ পেতে গরিব অসহায় মানুষদের পকেট কাটছে।
অবৈধ, মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এরকমের প্রতারণা সাধারণ মানুষসহ প্রশাসনের নাকের ডগায় চললেও ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলোর ব্যবসার সাথে পাথরঘাটার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা জড়িত থাকার কারণে কোনরকম ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন।
দেখা গেছে কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা সেবার প্রচার করার জন্য একের পর এক মাইক নিয়ে প্রচারের প্রতিযোগিতায় নেমে যায় এক দল চিহ্নিত পেশাজীবি প্রচারক।তারা শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সকল জায়গায় নামিদামি অনেক ডাক্তারদের নাম প্রচার করতে থাকে।মাইকের শব্দে পরিবেশ দূষণ সহ শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত সবাই অতিষ্ঠ হলেও কর্তৃপক্ষ যেন দেখেও দেখছে না।
রেকর্ড করা চটকদারি বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে উপজেলার সহজ সরল সাধারণ মানুষ উল্লেখিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এসে বারে বারে ধোঁকা খাচ্ছে।
সাধারণ মানুষদের কাছে যে সকল ডাক্তার ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয় পক্ষান্তরে রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসে মাইকে প্রচারকরা ডাক্তার ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সাথে কোন রকম মিল না পেলেও ফাঁদে আটকে পড়েন।
রোগীদেরকে কম খরচে চিকিৎসা সেবার কথা বলে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এনে হাতে ধরিয়ে দেন কতগুলো রোগ নির্ণয়ের পরিক্ষার তালিকা।
দেখা যায় বেশীরভাগ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগ পরিক্ষা নিরিক্ষা করার ভালো যন্ত্রপাতি না থাকলেও করে দেন সব ধরণের পরিক্ষা।
দিনে কয়েকজন রোগীকে ফুসলিয়ে আনতে পারলেই পরিক্ষার নামে মিলে মোটা অংকের টাকা।
জানা গেছে হাতে গোনা কয়েকটি ক্লিনিকের বৈধ কাগজ ও চিকিৎসা সেবার পরিবেশ এবং সরঞ্জামাদি থাকলেও বাকি অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সরঞ্জামাদি এবং চিকিৎসা করার মত পরিবেশ না থাকলেও থেমে নেই তারা।
দেখা গেছে মানহীন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলো সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্য চড়া বেতন দিয়ে মার্কিটিং অফিসার নামে নিযুক্ত করেন একদল মধ্যসত্বভুগী।পরে মধ্যেসত্বভুগীদের এলাকা ভাগ করে দেওয়া হয়।তাদের কাজ হল গোটা উপজেলার যত ফার্মিসী এবং পল্লীচিকিৎসক আছে তাদের সাথে রোগী পাঠাবার জন্য চুক্তিকরা।নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েটি ক্লিনিকের কর্মচারী বলেন গ্রাম থেকে কোন পল্লীচিকিৎসক অথবা কোন ওষুধ ব্যবসায়ী ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠালে রোগীর যতগুলো পরিক্ষা হবে পরিক্ষা মুল্যের মোট টাকার ৬০ ভাগ যার মাধ্যমে রোগী আসবে তাকে দিতে হবে।
রোগ নির্ণনয় করার পরিক্ষার পার্সেটিসে থেমে নেই কতিপয় চিকিৎসকরাও।তারাও টাকার লোভে দিয়ে থাকেন অযথা অনেক পরিক্ষা।এছাড়া অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষের সাথে রোগ নির্ণনয় করার চুক্তিই থাকে একই ভাবে চুক্তি থাকে ওষুধ কম্পানির লোকজনের সাথেও।
ওষুধ কম্পানির লোকজন অনেক চিকিৎসককে তাদের নিন্মমানের ওষুধ লেখানোর জন্য টিভি ফ্রিজ থেকে শুরুকরে অনেক চিকিৎসকের স্ত্রীর গহনা পর্যন্ত গিফট করেন।এভাবে গ্রামের একজন সহজ সরল গরীব রোগী অসাধু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ এবং কতিপয় অসাধু চিকিৎসকের টাকা কামাইকরার মেশিনে পরিনত হণ। অপরদিকে চিকিৎসা সেবার নামে বিনা প্রয়োজনে অনেকগুলো ভুয়া পরিক্ষা সহ নিন্মমানের ওষুধ ক্রয় করে একেরপর এক প্রতারিত হতে থাকেন নিরীহ রোগী ও তাদের পরিবার।
অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বরগুনা জেলা কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরগুনা জেলা শাখার সভাপতি, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি পাথরঘাটা উপজেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং সৈয়দ ফজলুল হক ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. জিয়াউল করিম বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নামসর্বস্ব ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত বহু ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আজ সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে এক ভয়াবহ বাণিজ্যে মেতে উঠেছে। প্রতারণা, ভুল চিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান অসহায় রোগীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব, অদক্ষ জনবল, দায়িত্বহীনতা এবং মানহীন সেবার কারণে রোগীদের জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। মানুষের জীবন নিয়ে এমন নির্মম ব্যবসা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
মো. জিয়াউল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সেই অধিকারকে পুঁজি করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে কঠোর, কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অনিয়ম ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। কারণ সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “রাষ্ট্র যদি জনগণের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রতারক চক্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি যেমন বাড়বে, তেমনি মৃত্যুঝুঁকিও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”
জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরুরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং সারা দেশে অবৈধ ও অনিয়মকারী ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনার জোর দাবি জানান। তিনি বলেন, “মানুষের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের বাণিজ্য বা প্রতারণা সহ্য করা হবে না। জনগণের নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এখনই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ।”
জানতে চাইলে বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন পাথরঘাটায় অবৈধ অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে এবং ইতোমধ্যে তাদের তালিকা করা হচ্ছে, দ্রুত অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপশ পাল এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন পাথরঘাটা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত অবৈধ ও মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পাথরঘাটা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডাঃ সাঈদুর রহমান বলেন আমি এখানে নতুন এসেছি তবে এরকমের অভিযোগ পেয়েছি, তিনি বলেন শীঘ্রই মানহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের তালিকা করে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
পাথরঘাটা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক চৌধুরী মোঃ ফারুক ওকবি ইদ্রিস আলী খান বলেন রোগ নির্ণয়ের জন্য যেসকল টেস্ট দেওয়া হয় আসলেই ওই সকল টেস্টের আদৌ দরকার আছে কি না, এবিষয় স্বাস্থ্য প্রশাসকের পক্ষ থেকে প্রতিটি উপজেলার একজন কর্মকর্তা নিযুক্ত করা উচিত।
তা হলে টেস্ট বাণিজ্য বহুলাংশে কমে আসবে।


