কিশোরগঞ্জের ভৈরব সরকারি মহিলা কলেজের দুই প্রভাষকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক আমিনা ফেরদৌস এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ মামুন কাউসারের নাম উঠে এসেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উক্ত দুই শিক্ষক গত প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর নিয়মিত কলেজে উপস্থিত না থেকেও বকেয়া বেতন-ভাতা গ্রহণের চেষ্টা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) একাধিকবার তদন্ত পরিচালনা করে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনটি তদন্ত প্রতিবেদনের মধ্যে অন্তত দুটি প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অনুপস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে।এদিকে, ৩০ নভেম্বর ২০২১ তারিখে সরকারি জিল্লুর রহমান মহিলা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. জাকির হোসেন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে (স্মারক নং- সজিমক/বিবিধ/৬৬০/২১) মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে সমাজকর্ম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কে.এম. হাবিবুর রহমানের ৩ জুলাই ২০২১, ৬ আগস্ট ২০২১ ও ৪ অক্টোবর ২০২১ তারিখের অভিযোগের আলোকে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান।চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক আমিনা ফেরদৌস (অনার্স শ্রেণির জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত) এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কলেজ ও বিভাগে অনুপস্থিত ছিলেন। তার অনুপস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা ও বিভাগীয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। এছাড়া, তিনি পূর্বেও অধ্যক্ষকে অবহিত না করে অনুপস্থিত ছিলেন এবং সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদনে তাকে অনুপস্থিত হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, তখন তার এমপিওভুক্তি বা নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান ছিল এবং তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। চিঠিটি ২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে গ্রহণ করা হয়েছে বলে দাপ্তরিক সিলমোহরে উল্লেখ রয়েছে।এ ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো শিক্ষক যদি বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে কীভাবে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণের সুযোগ পান। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা মনে করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে সমাজকর্ম বিভাগের প্রভাষক আমিনা ফেরদৌস বলেন,“আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। আমি দীর্ঘ সময় বিনা কারণে অনুপস্থিত ছিলাম না। ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কিছু জটিলতার কারণে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারিনি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে এবং আমি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছি।তিনি আরও বলেন,“আমার বেতন-ভাতা সংক্রান্ত বিষয়টিও নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে আমি বিশ্বাস করি। যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকে, সেটি তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।”
অভিভাবকদের উদ্বেগকলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন,“আমরা আমাদের সন্তানদের ভালো শিক্ষার জন্য কলেজে পাঠাই। যদি শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাসে না আসেন, তাহলে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত।”
আরেকজন অভিভাবক বলেন,“সরকার শিক্ষকদের বেতন দেয় শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য। কিন্তু তারা যদি দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক। আমরা চাই, তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
একজন নারী অভিভাবক জানান,“আমাদের মেয়েরা ঠিকমতো ক্লাস পাচ্ছে কি না, সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকদের অনুপস্থিতি বন্ধ করে নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করতে হবে।”
এ বিষয়ে কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মো. মজিবুর রহমান বলেন,“দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে, তা আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগের বিষয়। বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত জানি না। তবে যেহেতু এটি আমার কলেজের ঘটনা, তাই অভিযোগের কারণ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করব।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী জানান, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন কলেজে নিয়মিত আসতেন না এবং এ নিয়ে একাধিকবার তদন্ত হয়েছে। তারা বকেয়া বেতন-ভাতা বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অন্যদিকে, ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ মামুন কাউসারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পড়ুন:চুক্তির প্রভাবে বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম
দেখুন:
ইমি/


