দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশের ওপর গিয়ে পড়ে। তবে যখন সেই প্রভাব মানবাধিকার, কূটনৈতিক শিষ্টাচার এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় আস্থার প্রশ্নে রূপ নেয়, তখন বিষয়টি আর কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ঘিরে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা,ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কথিত “পুশ-ইন” এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দিল্লি বিমানবন্দর থেকে ফিরে আসা, এমনই একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে।
প্রথম ঘটনাটি মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় ঘটনাটি কূটনৈতিক সৌজন্য, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকটকে সামনে এনেছে। দুটি ঘটনাই আলাদা হলেও উভয়ের মধ্যে একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে, বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের নীতিগত অবস্থান এবং সেই অবস্থানের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের সম্ভাব্য প্রভাব।
সীমান্তে পুশ-ইন: মানবাধিকার না কি অভিবাসন রাজনীতি?
গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশ সীমান্তে কথিত “পুশ-ইন” নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি জানিয়েছে, জুন মাসের শুরু থেকে শিশুসহ দুই শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার অন্তত ২১টি প্রচেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে।
এই অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পায় যখন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। সংস্থাটি বলেছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর সদস্যদের, বিশেষ করে মুসলমানদের,যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলীর বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রশ্নে বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু সেই বিরোধের সমাধান কখনোই সীমান্তে নারী, শিশু ও পরিবারকে আটকে রেখে করা যায় না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কাউকে জোরপূর্বক বহিষ্কার করার আগে তার পরিচয়, নাগরিকত্ব, আইনি অধিকার এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হয়।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। যদি এসব মানুষ সত্যিই বাংলাদেশি হন, তাহলে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে। আর যদি তারা ভারতীয় নাগরিক হন, তাহলে তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। দুই ক্ষেত্রেই “পুশ-ইন” কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।
বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলো অনিয়মিত অভিবাসন মোকাবিলা করে। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত, ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্য রুট কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রোহিঙ্গা সংকট,সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কেন্দ্রীয় বিষয় হলো “ডিউ প্রসেস” বা আইনি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভোটার তালিকা, নাগরিকত্ব ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
এইচআরডব্লিউ তাদের প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নাগরিকত্ব ও ভোটার পরিচয়ের প্রশ্ন একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে “অনুপ্রবেশকারী” এবং “অবৈধ অভিবাসী” প্রসঙ্গ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষত বাংলাভাষী মুসলমান জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এই বিতর্ক অনেক সময় রাজনৈতিক মেরুকরণের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
২০১৯ সালে আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রক্রিয়ার সময় প্রায় ১৯ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা এখনো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আলোচনার বিষয়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই পুরোনো উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
অতএব প্রশ্ন উঠছে, সীমান্তে পুশ-ইনের অভিযোগ কি কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার অংশ, নাকি এটি বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের বহিঃপ্রকাশ?
দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনা: প্রশাসনিক যাচাই নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ভারত সরকারের আমন্ত্রণে আয়োজিত ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লি যান। সফরের বিষয়ে আগাম কূটনৈতিক নোট পাঠানো হয়েছিল। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই তাঁর সফর সম্পর্কে অবগত ছিল।
কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁকে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় আটকে রাখা হয়। পরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও তিনি অপমানিত বোধ করে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় সূত্রগুলোর বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা স্বীকার করেছে যে জাহেদ উর রহমানের অতীতের ভারতবিষয়ক বক্তব্য এবং ইউটিউব আলোচনাগুলো যাচাইয়ের অংশ ছিল। এখানেই মূল প্রশ্নটি নিহিত।
একজন আমন্ত্রিত বিদেশি সরকারি প্রতিনিধিকে তাঁর অতীত রাজনৈতিক মতামতের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে আলাদা করে যাচাই করা হলে সেটি কি কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে, নাকি তা রাজনৈতিক বার্তাও বহন করবে? বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সাধারণত সমালোচনাকে নিরাপত্তা ঝুঁকির সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করে না। বিশেষত যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একটি স্বীকৃত সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি।
ভারত যদি শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রবেশের অনুমতি দিয়েই থাকে, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, দুই ঘণ্টার বিলম্বের প্রয়োজন কী ছিল? এই ঘটনাকে হয়তো অনেকেই একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখবেন। কিন্তু কূটনীতিতে প্রতীকী ঘটনা অনেক সময় বাস্তব নীতির চেয়েও বড় প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আস্থার নতুন ভিত্তি গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনাটি উল্টো বার্তা দিয়েছে।
বাংলাদেশে অনেকেই এটিকে ভারতের পক্ষ থেকে একটি “সিগন্যাল” হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ভারতের একটি অংশ এটিকে নিরাপত্তাজনিত নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধারণাই অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি একটি দেশ মনে করে যে তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে, তাহলে সেই অনুভূতি সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও কিছু প্রশ্ন
এই আলোচনায় বাংলাদেশের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
দিল্লি বিমানবন্দরের ঘটনায় প্রতিনিধি দলের বাকি সদস্যরা বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য এগিয়ে যান। বাস্তবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হয়তো রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু কূটনৈতিকভাবে এটি একটি প্রশ্নও তৈরি করেছে, সংকট মুহূর্তে একটি প্রতিনিধি দল কতটা ঐক্যবদ্ধ ছিল? আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের মর্যাদা মুখ্য। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশেরও আরও সুসংগঠিত কৌশল প্রয়োজন।
বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে একটি পরিবর্তনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের পর দুই দেশই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। ভারতের জন্য বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়; এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, বঙ্গোপসাগরীয় কৌশল এবং সংযোগনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অংশীদার। এই বাস্তবতায় সীমান্তে মানবাধিকার বিতর্ক এবং কূটনৈতিক অস্বস্তি কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়।
সামনে করণীয়
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে প্রয়োজন তিনটি বিষয়।
প্রথমত, সীমান্তে পুশ-ইন সংক্রান্ত অভিযোগের স্বাধীন ও যৌথ তদন্ত।
দ্বিতীয়ত, নাগরিকত্ব ও প্রত্যাবাসন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনের পূর্ণ অনুসরণ।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৃষ্ট আস্থার ঘাটতি দূর করতে উচ্চপর্যায়ের নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপ।
কারণ শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনো একটি সরকার, কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা কোনো একটি নির্বাচনের চেয়েও বড়।
সীমান্তে আটকে থাকা একটি শিশু, দিল্লি বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ একজন সরকারি প্রতিনিধি কিংবা দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক বিশ্বাস, এসবই মনে করিয়ে দেয় যে প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি শক্তি নয়, আস্থা; চাপ নয়, সম্মান; এবং রাজনৈতিক সুবিধা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক স্বার্থ।
দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সীমান্তের শূন্যরেখা পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আস্থার ভিত্তিকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দুই দেশ সেই প্রশ্নের উত্তর সংঘাত দিয়ে দেয়, নাকি সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে।
লেখক : জাফরিন আকতার, শিক্ষার্থী, চতুর্থ বর্ষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ।
পড়ুন : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?


