বিজ্ঞাপন

কাগজে ১২৭ শ্রমিক, মাঠে চলেছে মেশিন! খাল খননে কৃষকের জমি দখল

অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রকল্প কীভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, তার একটি আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের একটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প। ‘অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)’ এর আওতায় ৫১ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে ভেকু (এস্কাভেটর) দিয়ে খনন, কাগজে-কলমে শ্রমিক দেখানো, হাজিরা খাতা ইউপি সদস্যের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমি কেটে খাল নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের নামফলক সূত্রে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির নাম ‘দমদমা মন্দিরের ১০০ মিটার দক্ষিণ হতে বিশ্বনাথপুর ব্রিজ পর্যন্ত রাণীগাঁও-দমদমা খাল পুনঃখনন’। প্রকল্পে প্রাক্কলিত মাটির কাজের পরিমাণ দুই লাখ ৮৫০ ঘনমিটার। বরাদ্দ ৫১ লাখ ৩১ হাজার ৯৫৪ টাকা। এরমধ্যে শ্রমিক মজুরি বাবদ ২৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং নন-ওয়েজ খাতে ২৫ লাখ ৯১ হাজার ৯৫৪ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। প্রকল্পে ১২৭ জন শ্রমিকের জন্য ৪০ দিনের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির এই কাজ ১৮ এপ্রিল ২০২৬ শুরু হয়ে ৬ জুন ২০২৬ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের সভাপতি খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুল হক।

ইজিপিপি কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো এলাকার অতিদরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য অস্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রকল্পের মূল খননকাজ ইতোমধ্যেই ভেকু (এস্কাভেটর) মেশিন দিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রকল্পে কর্মরত কয়েকজন আদিবাসী ও সাধারণ শ্রমিক জানান, মেশিন দিয়েই খালের অধিকাংশ খননকাজ শেষ করা হয়েছে।

বর্তমানে প্রকল্প এলাকায় ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিককে মাটি সমান করা এবং রাস্তার পাশে গাছের চারা রোপণের কাজ করতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, এসব কাজ মূল প্রকল্পের আওতাভুক্ত নয়। বরং প্রকল্প চলমান রয়েছে- এমন ধারণা তৈরির জন্য শ্রমিকদের দিয়ে এসব কাজ করানো হচ্ছে। শ্রমিকদের মাধ্যমে নার্সারি থেকে আনা মেহগনি চারা রোপণ করতেও দেখা গেছে।

প্রকল্পে কাগজে-কলমে ১২৭ জন শ্রমিকের নাম থাকলেও বাস্তবে মাঠে পাওয়া গেছে মাত্র ৪০-৪২ জনকে। বাকি প্রায় ৮০ জনের কোনো উপস্থিতি দেখা যায়নি। উপস্থিত শ্রমিক আব্দুল মুতালিব ও আলাল মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনুপস্থিত শ্রমিকদের বিষয়টি দেখভাল করেন স্থানীয় ইউপি সদস্য আসাদ মিয়া।

এদিকে, প্রকল্প পরিচালনায়ও নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিধি অনুযায়ী শ্রমিকদের সর্দারের কাছে হাজিরা খাতা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা থাকে খারনৈ ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আসাদ মিয়ার কাছে। শ্রমিকদের দাবি, তিনিই পুরো কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং খাল খননের পরিবর্তে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক ও একটি বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা সংস্কারের কাজেও শ্রমিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রকল্পের আওতায় পড়ে না।

প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন দমদমা গ্রামের কৃষক মার্কণ্ড দয়াল হাজং। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি খালের নির্ধারিত ম্যাপ অনুসরণ না করে তার ব্যক্তিমালিকানাধীন ফসলি জমির ওপর দিয়ে খাল খনন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “আমার প্রায় ৫ থেকে ৬ কাঠা জমি খালের মধ্যে নিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে আমার ধানের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে এবং সেচের মোটর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরকারি খালের মূল হালট বাদ দিয়ে অন্যায়ভাবে আমার জমির ওপর দিয়ে খাল নেওয়া হয়েছে। আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

এ বিষয়ে ইউপি সদস্য মো. আসাদ মিয়ার কাছে গাছ লাগানোর জন্য আলাদা কোনো বাজেট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি খারনৈ ইউপি চেয়ারম্যান জানেন। কাগজে ১২৭ জন শ্রমিক থাকলেও মাঠে ৪০-৫০ জন শ্রমিকের উপস্থিতির বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তবে হাজিরা খাতা তার কাছেই থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।

প্রকল্পের সভাপতি ও খারনৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ওবায়দুল হক ভেকু ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “নন-ওয়েজ খাতের বরাদ্দ থেকে মেশিন দিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে অতিরিক্ত লোক নিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।” দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ অনুযায়ী সঠিকভাবে খাল খনন করা হয়েছে দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে, কলমাকান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মমিনুল ইসলামের সরকারি ও ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে স্থানীয় গণমাধ্যম প্রতিনিধিকে তিনি বলেন, “নন-ওয়েজ বাজেটের আওতায় এস্কাভেটর ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।” তবে প্রকল্পের শ্রমিকদের দিয়ে অন্য রাস্তার কাজ করানো এবং কাগজে থাকা শ্রমিকদের অধিকাংশের অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, “এ ধরনের ঘটনা হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।”

সার্বিক অনিয়মের বিষয়ে জানতে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম মিকাইল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “আমি তো গ্রামের মধ্যে একটা প্রোগ্রামে আছি, আপনাকে পিআইও সাহেবের নাম্বারটা দিয়ে দিচ্ছি, আপনি কথা বলেন।

পড়ুন:চুক্তির প্রভাবে বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম

দেখুন:সুন্দরবনের শেলা নদীতে কুমিরের আ/ক্র/ম/ণে নারীর মৃ/ত্যু 

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন