মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা এসেছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতারের পক্ষ থেকে। একই সময়ে লেবানন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির দাবি করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তবে এসব কূটনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেও দক্ষিণ লেবাননে অনির্দিষ্টকাল সেনা মোতায়েন রাখার ঘোষণা দিয়ে ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন কূটনৈতিক সমঝোতার নতুন কাঠামো দৃশ্যমান হচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও সামরিক বাস্তবতা এখনো পুরোপুরি বদলে যায়নি। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এই দুই ধারার সমান্তরাল উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী সমঝোতার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনা এগিয়ে নিতে নতুন কারিগরি কাঠামো তৈরিতে সম্মত হয়েছে। এর আওতায় পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি নিয়ে পৃথক কর্মীদল গঠন করা হবে।
এছাড়া পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রধান আলোচকরা নিয়মিতভাবে এই কমিটিকে অগ্রগতির বিষয়ে অবহিত করবেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, আলোচনা আর কেবল বিচ্ছিন্ন বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং একটি কাঠামোবদ্ধ ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে যাচ্ছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, উভয় পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক কাঠামো খুব কমই দেখা গেছে। ফলে এই রোডম্যাপ আলোচনাকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উত্তেজনা কমাতে সরাসরি যোগাযোগ চ্যানেল
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে দুই পক্ষ একটি সরাসরি যোগাযোগ চ্যানেল চালু করবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এই পথকে কেন্দ্র করে অতীতে বহুবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সরাসরি যোগাযোগের সিদ্ধান্ত কেবল রাজনৈতিক সংলাপ নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সামনে এসেছে।
লেবানন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আশাবাদী ইরান
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অগ্রগতির পাশাপাশি লেবানন ইস্যুতেও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। পাকিস্তান ও কাতারের যৌথ বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, মধ্যস্থতাকারী দুই দেশের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে লেবানন যুদ্ধ শেষ করার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, এই অগ্রগতির অংশ হিসেবে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির ওপর থাকা কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে অবরোধ তুলে নেওয়া, জব্দকৃত কিছু সম্পদ মুক্ত করা এবং বড় ধরনের পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালুর কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কতাও রয়েছে তার বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, ঘোষিত অগ্রগতির বাস্তব কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রথম বড় পরীক্ষা হবে ‘লেবানন ডি-কনফ্লিকশন সেল’। অর্থাৎ রাজনৈতিক ঘোষণা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান রয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
ভিন্ন বাস্তবতার বার্তা দিল ইসরাইল
কিন্তু কূটনৈতিক পর্যায়ে আশাবাদী বার্তা এলেও মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি এখনো জটিল। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইসরাইলের অবস্থান।
রোববার প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরাইলি সেনাবাহিনী যতদিন প্রয়োজন ততদিন অবস্থান করবে।
তার ভাষায়, উত্তরাঞ্চলের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থেকে ইসরাইলকে কিছুই সরাতে পারবে না।
এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরাইল এখনই দক্ষিণ লেবানন থেকে নিজেদের নিরাপত্তা উপস্থিতি প্রত্যাহারের কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত এলাকাগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির প্রস্তুতির কথাই সামনে এসেছে।
একই সঙ্গে নেতানিয়াহু আবারও বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ এগোলেও ইসরাইলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং ইরানবিরোধী অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
সেনা কার্যক্রমে ‘কোনো বিধিনিষেধ নেই’
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজও একই ধরনের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, লেবাননে হুমকি মোকাবিলায় ইসরাইলি সেনাদের কার্যক্রমে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তার দাবি, নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত এলাকায় সেনারা এখনো অবস্থান করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রাখে।
এই বক্তব্য যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে তেলআবিব।
যুদ্ধবিরতি, কিন্তু উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ নয়
শুক্রবার ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা জানানো হলেও পরদিন হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হওয়ার খবর এসেছে। এতে বোঝা যায়, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
একদিকে কূটনৈতিক অগ্রগতির ঘোষণা, অন্যদিকে প্রাণহানির ঘটনা—এই দুই বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে, সংঘাত-পরবর্তী পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
হিজবুল্লাহর শর্তসাপেক্ষ অবস্থান
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হিজবুল্লাহর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরাইল যদি যুদ্ধবিরতি মেনে চলে, তাহলে তারাও তা অনুসরণ করবে। তিনি বলেন, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পর থেকে হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা ইসরাইলি বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালায়নি।
তবে একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীর অবাধ চলাচলের কোনো অধিকার নেই। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি মানার প্রতিশ্রুতি দিলেও ইসরাইলের নিরাপত্তা অঞ্চলের ধারণাকে তারা মেনে নিচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র-লেবানন আলোচনা নিয়েও আপত্তি
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও লেবানন সরকারের মধ্যে চলমান প্রত্যক্ষ আলোচনারও বিরোধিতা করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটির মতে, ওয়াশিংটনে অবস্থানরত লেবাননের প্রতিনিধিদের ওপর এমন কিছু শর্ত মেনে নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা দেশটির সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, এসব আলোচনা পরোক্ষভাবে ইসরাইলের স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাদের মতে, আলোচনার বর্তমান ভিত্তি লেবাননের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে দেশটিকে এমন অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে, যা কার্যত আত্মসমর্পণের সমতুল্য।
গোষ্ঠীটির ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের এই অংশগ্রহণ শত্রুপক্ষের পরিকল্পনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে এবং প্রতিরোধ যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগকে খাটো করবে।
কূটনৈতিক অগ্রগতি ও সামরিক বাস্তবতার মধ্যবর্তী মধ্যপ্রাচ্য
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে দুটি সমান্তরাল প্রবণতা কাজ করছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ এবং পাকিস্তান-কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, লেবাননকে কেন্দ্র করে ইসরাইল, হিজবুল্লাহ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব-সংক্রান্ত অবস্থান এখনো দৃশ্যমানভাবে পরস্পরবিরোধী।
ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ এখনো পুরোপুরি সুগম হয়নি। বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, আলোচনার টেবিলে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে আস্থার সংকট, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
পড়ুন: মিশরের ইতিহাস, দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপে প্রথম জয়
আর/


