নতুন পররাষ্ট্রনীতি কাঠামোর অংশ হিসেবে চীন থেকে ২৪টি জে-১০সিই মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
সোমবার (২২ জুন) শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে কেন্দ্র করে এই সামরিক চুক্তিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চলতি বছরের আগস্টের মধ্যেই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৪ কোটি বা ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
চুক্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে গত সপ্তাহে একটি চীনা প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসে। বেইজিং সফরের সময় বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা চীনের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে চুক্তির বিস্তারিত চূড়ান্ত করবেন বলে জানা গেছে।
এই প্রতিরক্ষা আলোচনা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি সূত্রগুলো আশা করছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের বৈঠকের পর একটি যৌথ ইশতেহারের মাধ্যমে সম্পর্ককে ‘শেয়ার্ড ফিউচার’ বা অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারিত্বে উন্নীত করার ঘোষণা আসতে পারে।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীন মিলিয়ে প্রায় ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়েও আলোচনা হতে পারে। পাশাপাশি মংলা বন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পেও অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
মংলায় ১১০ একর জমিতে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তুতি চলছে, যেখানে চীনা বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এই শিল্প পার্কটি আগে ভারতীয় বিনিয়োগের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং একটি মুম্বাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও হয়েছিল। তবে বিডার এক কর্মকর্তা জানান, ওই চুক্তি বাতিল হওয়ায় এখন এই জমি চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত।
এর আগেই চট্টগ্রামে একটি চীনা বিশেষ শিল্প পার্ক অনুমোদন পেয়েছে, যেখানে বেইজিং প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, প্রধান লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। চীনের উৎপাদন খাত বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এই ঘনিষ্ঠতা প্রতিবেশী ভারতের নজরদারির বাইরে থাকবে না। বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং নদী ব্যবস্থাপনার সম্পর্কের কারণে এই পরিবর্তন আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি দুই দেশের সীমান্তে পুশ-ইন এবং বিমানবন্দর-সংক্রান্ত কিছু ঘটনাকে বিশ্লেষকেরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
অতীতে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একমুখী ছিল বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। তবে বর্তমান সরকার বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও ভারত—সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিশেষ করে কৃষিপণ্য আমদানি বাড়ানোর মাধ্যমে সম্পর্ক আরও গভীর করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং ব্রিকস জোটে অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা চলমান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন বাংলাদেশকে ব্রিকস কাঠামোর দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
এছাড়া ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের সফরের পরিকল্পনার কথাও আলোচনায় রয়েছে, যদিও দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনকে জটিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারত কেন উদ্বিগ্ন?
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি ভারতের কৌশলগত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একাধিক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কৌশলগত ভারসাম্য ও প্রভাব: এই বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম কেনার ফলে ঐতিহাসিকভাবে ভারতের প্রভাব বলয়ে থাকা বাংলাদেশে চীনের প্রতিরক্ষা প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সাথে মূল ভারতের সংযোগকারী অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা হলো শিলিগুড়ি করিডোর। বাংলাদেশ এই আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলো গ্রহণ করলে তা ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি: জে-১০সিই যুদ্ধবিমানগুলো চীনের চতুর্থ প্রজন্মের অত্যন্ত শক্তিশালী মাল্টিরোল ফাইটার, যা ভারতের আকাশসীমার প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ।
দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন: বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কে একধরনের টানাপোড়েন চলছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের পর দ্বিতীয় দক্ষিণ এশীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চীন থেকে এমন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করা ভারতের কৌশলগত সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পড়ুন: ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর শঙ্কা, বাড়তে পারে বৈশ্বিক দুর্যোগ
আর/


