মেহেরপুর জেলার তিন দিকজুড়ে বিস্তৃত ভারতীয় সীমান্ত। দীর্ঘ এই সীমান্তপথ দিয়ে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ বা ‘পুশইন’ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এদিকে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) সম্প্রতি নতুন কৌশলে বাংলাদেশে লোকজন ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তসংলগ্ন পাটক্ষেত ও ফসলি জমির আড়াল ব্যবহার করে লোকজনকে শূন্যরেখার কাছে এনে অবস্থান করানো হচ্ছে।
সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কাঁটাতারের বেড়ার ভারতীয় অংশ ঘেঁষে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি রয়েছে। এসব জমির অনেকগুলোই নো-ম্যানস ল্যান্ডের খুব কাছাকাছি হওয়ায় সেগুলোকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি। উঁচু পাটক্ষেত ও ঘন ফসলের আড়ালে লোকজনকে এনে রাখা হয়, যাতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা স্থানীয়দের পক্ষে সহজে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব না হয়।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, বিএসএফ সদস্যরা অস্ত্রের মুখে লোকজনকে সীমান্তের কাঁটাতারের নির্দিষ্ট প্রবেশমুখ দিয়ে নো-ম্যানস ল্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় নিয়ে আসে। এরপর তাদের পাটক্ষেত কিংবা ঘন ফসলের মধ্যে অপেক্ষা করতে বলা হয়। সুবিধাজনক সময়, বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে, তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি মেহেরপুর সদর উপজেলার বুড়িপোতা খালপাড়া সীমান্তে এমন একটি ঘটনার ভিডিওচিত্র ড্রোন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, কাঁটাতারের ওপার থেকে কয়েকজন ব্যক্তি একটি ছোট খাল পার হয়ে পাটক্ষেতের ভেতর দিয়ে সীমান্তের শূন্যরেখার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিনই এমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে।
সীমান্তবাসীরা আরও জানান, দিনের বেলায় লোকজনকে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় জড়ো করে রাখা হয়। পরে রাত গভীর হলে সুযোগ বুঝে তাদের বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় সীমান্ত এলাকায় ঘন পাটক্ষেত থাকায় অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত ও আটক করা বিজিবির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিকেলের পর থেকে সীমান্তের ওপারে বিএসএফ সদস্যদের টহল বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন সময় সদস্যভর্তি পিকআপ ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহনে করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন এনে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নামানো হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তারা। তাদের ভাষ্য, রাতের আঁধারে এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যেই এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সার্চলাইটের ব্যবহারও কমিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষও সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। রাত নামলেই বিভিন্ন গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দারা লাঠি ও টর্চ হাতে পাহারায় অংশ নিচ্ছেন। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিজিবিও নিয়মিত টহল ও নজরদারি পরিচালনা করছে।
চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবি ব্যাটালিয়ন সূত্র জানিয়েছে, ভারত থেকে যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে মেহেরপুর সীমান্তে নজরদারি সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। সীমান্তজুড়ে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে বিশেষ চেকপোস্ট ও গোপন বাঙ্কার। সন্দেহজনক যেকোনো চলাচলের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাহিনীটি।
সীমান্তবাসীদের প্রত্যাশা, বিজিবি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত সতর্কতা অব্যাহত থাকলে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পুশইনের যেকোনো অপচেষ্টা কার্যকরভাবে প্রতিহত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং বিদ্যমান সীমান্ত চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

