বিজ্ঞাপন

হোলি আর্টিজান হামলার ১০ বছর: কী ঘটেছিল সেদিন?

রাজধানীর গুলশানে সংঘটিত হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক পূর্ণ হলো আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঘটে যাওয়া ওই হামলায় দেশি-বিদেশি ২০ জন নিহত হন। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত এই জঙ্গি হামলা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ব্যাপক আলোড়ন তোলে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান পরিচালিত হয়।

বিজ্ঞাপন

তৎকালীন গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর ভবনে অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে ইফতারের পর প্রবেশ করে পাঁচ তরুণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র সদস্য ছিল। তারা সেখানে প্রবেশ করে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায়।

রাতভর চলা জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে। অভিযানে হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচজনই নিহত হন। তারা হলেন নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ এবং খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হামলার আগেই তারা নিজ নিজ বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন।

হামলায় প্রাণ হারান ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, একজন ভারতীয়, দুইজন বাংলাদেশি এবং একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক। হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে নিহত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা।

নিহত ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশান থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ভেঙে ফেলা হয়। এখন পর্যন্ত সেটি পুনর্নির্মাণ করা হয়নি। অতীতে প্রতিবছর পুলিশের পক্ষ থেকে সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়নি।

একসময় প্রতি বছর হোলি আর্টিজানের ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা জানাতে যেতেন জাপান ও ইতালির দূতাবাসের প্রতিনিধিরা। তবে গত বছর সেই কর্মসূচিও হয়নি। এ বছর বিভিন্ন দূতাবাসের সমন্বয়ে ইতালি দূতাবাসে একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের উপকমিশনার এম তানভীর আহমেদ।

তিনি বলেন, দূতাবাসগুলো যৌথভাবে ইতালি দূতাবাসে দিনটি স্মরণ করবে। তবে ঘটনাস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদনের কোনো কর্মসূচি নেই। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে পৃথক কোনো আয়োজন বা ‘দীপ্ত শপথ’ পুনর্নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ উপলক্ষে আলাদা কোনো কর্মসূচি নেই। পুলিশের আত্মত্যাগ স্মরণে নির্ধারিত কর্মসূচিই পালন করা হয়।

কূটনৈতিক এলাকায় সংঘটিত এই হামলায় বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক নিহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি ব্যাপক গুরুত্ব পায়। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচার প্রায় সাড়ে তিন বছর চলে এবং তদন্তের সময় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায়ে হাইকোর্ট তাদের সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন। হামলার মূল পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে জানানো হয়।

কী ঘটেছিল সেদিন

২০১৬ সালের ১ জুলাই দিনটি ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যারাতে হঠাৎ করে খবর আসে গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোলাগুলিতে আহত হন বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র‌্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের কয়েকশ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেন। গণমাধ্যমকর্মীরাও ৭৯ নম্বর রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন। রাত সোয়া ১১টার দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন।

রাত ৪টা পর্যন্ত অস্ত্রধারীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

আইএসের দায় স্বীকার: রাতেই ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা বলে পরিচিত ‘আমাক’-এ গুলশান হামলার দায় স্বীকার করে ২০ জন নিহত হওয়ার কথা জানায়। আইএসের পক্ষ থেকে হামলাকারীদের মধ্যে পাঁচজনকে তাদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে, হামলার দায় নেয় তারা।

২ জুলাই অভিযান

রাতভর হলি আর্টিজান বেকারি সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর যৌথ সেনা, নৌ, পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল গুলশানে অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। সকাল পৌনে ৮টায় কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করেন।

এ সময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। সকাল সোয়া ৮টায় বেকারি থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশি নাগরিক তার মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন।

৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা। ৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।

‘থান্ডারবোল্ট’ নামে সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা যে অভিযান চালান সেখানে জঙ্গি হামলায় সরাসরি অংশ নেয়া পাঁচ তরুণের সবাই মারা পড়েন। তারা হলেন: মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাজ ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। সকাল ১০টায় ৪ জন বিদেশিসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মরদেহ পাওয়ার কথা পুলিশ জানায়। ১১টা ৫০ মিনিটে অভিযানে জঙ্গিদের ছয়জন নিহত এবং একজন ধরা পড়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।

ঘটনা যেভাবে জেনেছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা

দেশজুড়ে তখন ঈদের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা শহরের বেশিরভাগ মানুষ তখন ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামের দিকে ছুটছেন। শহর অনেকটাই ফাঁকা হতে শুরু করেছে।

বলছি ২০১৬ সালের পহেলা জুলাইয়ের কথা। ঢাকায় বিবিসি ব্যুরোতেও আমরা অনেকটা নির্ভার। খবরের তেমন কোন চাপ নেই।

দিনটি ছিল শুক্রবার। পরদিন শনিবার থেকে আমাদের অনেকরই ঈদের ছুটি শুরু হবার কথা। সেজন্য অফিসে উপস্থিত সহকর্মীরা মিলে ছোটখাটো একটি ইফতার পার্টির আয়োজনও হলো অফিসের ভেতরেই।

ইফতার শেষ করার আনুমানিক আধাঘণ্টা পরে একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে জানতে পারলাম গুলশান এলাকায় কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু কী ঘটেছে? সেটি তখনও নিশ্চিত নয়।

সাথে সাথে অফিসে উপস্থিত সহকর্মীদের সবাই একযোগে পুলিশকে ফোন করার কাজে লেগে গেলাম। কিন্তু কারও ফোনেই পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ হয়তো ফোন ধরছেন না, আবার অনেক কর্মকর্তার ফোন ব্যস্ত পাওয়া পাওয়া গেল।

ক্রমাগত চেষ্টার পর আমাদের একজন সিনিয়র সহকর্মী একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে সক্ষম হন। তিনি জানালেন যে গুলশানে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

তখনই আমরা আঁচ করতে পারলাম যে ঘটনা ছোটখাটো কিছু নয়।


এটা কি জঙ্গি হামলা?

পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র থেকে খোঁজ নেবার জন্য সহকর্মীরা ক্রমাগত ফোন করেই চলেছেন। কিন্তু ঘটনা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

এর মধ্যে আমি একজন ক্রাইম রিপোর্টারকে ফোন করলাম। তিনি আমাকে জানালেন, গুলশান দুই নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। তবে কেন ঘটেছে সেটি তখনো তিনি পরিষ্কারভাবে জানাতে পারলেন না।

এরই মধ্যে আমাদের একজন সহকর্মী জানালেন, তার পরিচিত একজনের বাসা গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কে।

দ্রুত তার মোবাইল ফোনে কল করলাম। প্রথম কয়েকবার তিনি ফোন ধরলেন না।

এক পর্যায়ে ফোন ধরে বললেন, তার বাসার পাশেই হোলি আর্টিজান বেকারিতে বেশ গোলাগুলি হয়েছে। আতঙ্কে তিনি কথা বলতে পারছিলেন না।

ঢাকায় বসবাসরত বিদেশী নাগরিকদের একটি টুইটার গ্রুপ ছিল। সেখানে একজন বিদেশি নাগরিক পোস্ট করে জানান যে তার একজন পরিচিত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে অবস্থান করছেন এবং সেখানে জিম্মিদশা তৈরি হয়েছে।

লন্ডনে অবস্থানরত বিবিসির একজন সহকর্মী সেটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনি বিষয়টি সবাইকে জানালেন।

তখন আর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে এটি সম্ভবত একটি জঙ্গি হামলা। কিন্তু বাংলাদেশের নিরাপত্তাবাহিনী তখনো কিছুই নিশ্চিত করে বলছে না। হয়তো তারা ঘটনা জানে কিন্তু সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি খোলসা করেনি।


পাল্টা হামলার ভয়

এরই মধ্যে খবর আসতে থাকে যে সেখানে দুজন পুলিশ কর্মকর্তা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল তখন ব্রেকিং নিউজ প্রচার শুরু হয়ে গেছে। সবাই গোলাগুলির বিষয়টি প্রচার করছিল।

রাত আটটায় বিবিসি ওয়ার্ল্ড টেলিভিশনে প্রথম লাইভ করলাম। তখন বিবিসিও প্রচার করছিল যে ঢাকায় একটি জিম্মিদশা তৈরি হয়েছে। যতটুকু তথ্য জোগাড় করতে পেরেছিলাম ততটুকু দিয়েই প্রায় সাত মিনিটের একটি লাইভ করলাম।

সেটি শেষ করেই বেশ দ্রুত বুলেট প্রুফ জ্যাকেট এবং হেলমেট পরিধান করে আমি এবং আমার আরেক সহকর্মী ১৫ মিনিটের মধ্যেই গুলশানে পৌঁছে গেলাম।

ঢাকার রাস্তায় তখন গাড়ির চলাচল একেবারেই কমে গেছে।

রাত সাড়ে আটটার মধ্যেই আমরা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি পুলিশ, র‍্যাব এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন গিজগিজ করছে।

পাশাপাশি রয়েছে বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক।


ভেতরের পরিস্থিতি

কিন্তু হলি আর্টিজান বেকারির কাছাকাছি কাউকে ঘেঁষতে দিচ্ছে না। বেশ খানিকটা দূরে পুলিশ ও র‍্যাব ব্যারিকেড দিয়েছে। ততক্ষণে আর কোন গোলাগুলি নেই। তবে যে কোন সময় আবার গোলাগুলি শুরু হতে পারে – এমন আশংকা ছিল।

৭৯ নম্বর সড়ক এবং আশপাশের রাস্তাগুলোতে কিছু গাছ থাকায় তখন বেশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। পরিস্থিতি আমার কাছে বেশ নাজুক মনে হচ্ছিল।

মনে হচ্ছিল, আবার যদি গোলাগুলি শুরু হয় তাহলে এখান থেকে বের হওয়া বেশ মুশকিল হবে। কিংবা হামলাকারীদের সহযোগীরা যদি সে এলাকায় পাল্টা হামলা চালায় তাহলে ব্যাপক হতাহত হবে।

এজন্য আমি ও আমার সহকর্মী কিছুটা দূরত্বে একটি নিরাপদ জায়গা বেছে নেই।

এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথম আমাদের প্রতি ঘন্টায় লাইভ সম্প্রচার করতে হচ্ছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড টিভিতে। সেটি করার জন্য আমাদের একটি যুতসই জায়গা দরকার।

দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, যদি আবারো পাল্টা গোলাগুলি হয়, তাহলে আমরা যাতে দ্রুত নিরাপদে সরে যেতে পারি।

হঠাৎ করে দেখলাম পুরো শরীরে রক্ত মাখা আহত এক ব্যক্তিকে বের করে আনা হচ্ছে। পুলিশ সদস্যরা তাকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে।

সেখানে উপস্থিত পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজনের সাথে কথা বলে দুটি বিষয় বুঝতে পারলাম।

প্রথমত, হামলাকারীরা ভেতরেই অবস্থান করছে।

দ্বিতীয়ত, তারা বয়সে তরুণ।

তৃতীয়ত, ভেতরে কিছু হতাহত হয়েছে।

তবে এটি কী ধরণের হামলা? এর উদ্দেশ্য কী? এসব নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কিছু বলছিলেন না।

র‍্যাব-এর ব্রিফিং

রাত সাড়ে দশটার দিকে (সঠিক সময় মনে নেই। আগে পরে হতে পারে) র‍্যাব-এর তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন।

মি. আহমেদের কথায় তখন ইঙ্গিত মিলেছিল যে ঘটনা বেশ গুরুতর।

র‍্যাব মহাপরিচালক তখন গণমাধ্যমকে অনুরোধ করেন ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে যেন সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করা হয়।

তিনি বলেন, “অনেকেই টিভি দেখছে। জাতীয় স্বার্থে, ভিতরে যারা আছে তাদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে, আমি মনে করি যে আপনাদের সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করতে হবে। আমাদের কাছ থেকে আপডেট নিয়ে আপনারা আপডেট দেন।

“যারা বিপথগামী লোকজন তাদের সাথেও আমরা কথা বলতে চাই। ভেতরে যারা আছে তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।”

এদিকে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিঘন্টায় বিবিসি ওয়ার্ল্ডে লাইভ চলছে।

বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিষয়টি খোলসা না করলেও পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং নানা সূত্র থেকে খবর মিলছে যে এটি একটি জঙ্গি হামলা।

র‍্যাব মহাপরিচালক সাংবাদিকদের ব্রিফ করার দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই ইসলামিক স্টেটের নিউজ সাইট আমাক হলি আর্টিজানের ভেতর থেকে হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে।


সেনা কমান্ডোর অভিযান

আমার যতদূর মনে পড়ে, রাত সাড়ে তিনটা নাগাদ খবর পেলাম যে ভোরে সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা অভিযান চালাবে। এবং এজন্য সিলেট থেকে তাদের ঢাকায় আনা হচ্ছে। কিন্তু সেটিও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিলাম না।

তবে ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গতিবিধি দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

এসব জল্পনা কল্পনার মধ্যেই ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে। এর কিছু আগে থেকেই শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় দিয়ে বিবিসি ওয়ার্ল্ড টিভির জন্য আবারো লাইভে দাঁড়ালাম।

এদিকে বুলেট প্রুফ জ্যাকেটের ভার এবং দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার কারণে আমি এবং আমার সহকর্মী তখন ক্লান্ত বোধ করতে শুরু করেছি।

কারণ এর আগে এতো বেশি সময় ধরে বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরে মাঠে রিপোর্ট করার অভ্যাস কিংবা অভিজ্ঞতা কোনটাই ছিলনা।

ভোর ছয়টায় তখন পুরোপুরি আকাশ পরিষ্কার।

আমি তখন হলি আর্টিজান বেকারি থেকে পুলিশ ব্যারিকেডের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন লোক এসে আমাকে জানালেন নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে। কারণ, যে কোন সময় অভিযান শুরু করবে সেনা কমান্ডোরা।

প্রবল উত্তেজনা আর আগ্রহ নিয়ে কিছুটা দূরত্বে একটি বাড়ির ছাদে যাই আমরা। সেখানে অপেক্ষা করতে থাকি।
অভিযান শুরু

এক পর্যায়ে সকাল আনুমানিক সাড়ে সাতটার দিকে অভিযান শুরু হয়। তীব্র গুলির শব্দে বুঝতে পারি যে অভিযান শুরু হয়েছে।

সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশী নাগরিক তার মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন।

অভিযানকারীরা ৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা।

অভিযান শেষ হয় ৯টা ১৫ মিনিটে। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।

সকাল ১০টায় ৪ জন বিদেশীসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মৃতদেহ পাবার কথা পুলিশ জানায়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১টা ৫০ মিনিটে জানান, অভিযানে জঙ্গিদের ছয় জন নিহত হয়েছে এবং একজন ধরা পড়েছে।

দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আইএসপিআর থেকে এক সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয় রেস্টুরেন্ট থেকে ২০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

পড়ুন: জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পাস

আর/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন