বিজ্ঞাপন

খিলক্ষেত থানার কমিউনিটি পুলিশিং: নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উদ্যোগে থানা-ভিত্তিক নতুন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটি গঠনের ধারাবাহিকতায় খিলক্ষেত থানার নবগঠিত কমিটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিটির কার্যনির্বাহী পরিষদ ও উপদেষ্টা পরিষদে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, এতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নবগঠিত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে মো. আক্তার হোসেনকে, যিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন খিলক্ষেত থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এম ফজলুল হক। সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে থানা বিএনপির সদস্যসচিব সোহরাব খান স্বপনকে। সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোবারক হোসেন দেওয়ান।

অভিযোগ রয়েছে, কার্যনির্বাহী কমিটির বাকি সদস্যরাও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের পদধারী নেতা বা সক্রিয় কর্মী। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে আট সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ নিয়েও। স্থানীয়দের ভাষ্য, কার্যনির্বাহী কমিটির ১৬ সদস্য এবং উপদেষ্টা পরিষদের ৮ সদস্যের মধ্যে প্রায় সবাই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে অন্য রাজনৈতিক মত, সামাজিক সংগঠন কিংবা নির্দলীয় ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব কার্যত অনুপস্থিত।

কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, অপরাধ প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা। এ কারণে শিক্ষক, ব্যবসায়ী, নারী প্রতিনিধি, তরুণ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সমাজসেবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের কমিটির গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশেই নির্ভর করে এর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ওপর।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, খিলক্ষেতের নবগঠিত কমিটিতে সেই ভারসাম্য প্রতিফলিত হয়নি। এতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রাধান্য থাকায় কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খিলক্ষেতের একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, “কমিউনিটি পুলিশিং একটি অরাজনৈতিক নাগরিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে যদি একটি রাজনৈতিক বলয়ের আধিপত্য থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

আরেকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ঘোষিত কমিটি যেভাবে করা হয়েছে, তাতে এটিকে ‘বিএনপি কমিউনিটি পুলিশ’ বললেও খুব একটা ভুল হবে না। কারণ এখানে সমাজের সব শ্রেণি-পেশা ও মতের মানুষের প্রতিনিধিত্ব দেখা যাচ্ছে না।”

একজন ব্যবসায়ী বলেন, “এ ধরনের কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ও বিভিন্ন মতের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। বাস্তবে সেটি কতটা হয়েছে, তা নিয়েই মানুষের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।”

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, শিক্ষামূলক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অনেক যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে কমিটিতে রাখা হয়নি। তাঁদের মতে, কমিটি গঠনের পুরো প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক হলে এ ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হতো না।

সুশাসন নিয়ে কাজ করা কয়েকজন পর্যবেক্ষক বলেন, প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে কাজ করা নাগরিক কমিটিগুলোতে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও সামাজিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব কমিটির কার্যকারিতা জনগণের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল। কোনো একটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবের অভিযোগ উঠলে সেই আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খিলক্ষেত থানার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কমিটি গঠনের সময় স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আপত্তি থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার সুযোগও রয়েছে।

এ বিষয়ে গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদ বলেন, “অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিউনিটি পুলিশিং কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়; এটি কমিউনিটির সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে পরিচালিত হওয়ার কথা, এবং সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করতে চাই।”

তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ মনে করেন, শুধু অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস নয়, কমিটি গঠনের পুরো প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করাও প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা ও ইতিবাচক ভূমিকার ভিত্তিতে কমিটি পুনর্গঠন করা হলে জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

তাঁদের ভাষ্য, কমিউনিটি পুলিশিং একটি জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ। এটি তখনই কার্যকর হবে, যখন সেখানে সমাজের সব শ্রেণি-পেশা, মত ও সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং এর নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্নের অবকাশ থাকবে না।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : পূর্বাচলকে ঢাকা জেলার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত অনুমোদন

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন