উন্নয়নের নামে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পকেট ভারী করার দিন শেষ বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, “সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল অন্ধের মতো বিরোধিতা করবে না, তবে সরকার দেশবিরোধী বা জনস্বার্থবিরোধী কিছু করলে সংসদে বাঘের গর্জন শোনা যাবে।”
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টায় নেত্রকোনা জেলা সার্কিট হাউজে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেত্রকোনা জেলা শাখা আয়োজিত ‘সাংবাদিকবৃন্দের সাথে মতবিনিময় সভা’য় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দীর্ঘ ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যে তিনি নেত্রকোনার স্থানীয় সমস্যা, সংসদীয় রাজনীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সীমান্ত হত্যা এবং মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
হাওর-বাওরবেষ্টিত নেত্রকোনা জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত দুরবস্থার কথা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ ৫৫ বছরে এই জেলার মানুষ শুধু কষ্ট আর বঞ্চনাই পেয়েছে। রাস্তাঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।”
নিজেকে ‘ইন্টার-ডিস্ট্রিক্ট ট্রাক’ এর সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, “দেশের সম্পদ নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা এলাকার নয়। যেখানে যার প্রয়োজন, রাষ্ট্রের সম্পদ সেখানেই পৌঁছাতে হবে।” নেত্রকোনার মাটি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা মাসুম মোস্তফার কথা উল্লেখ করে তিনি জেলার অধিকার আদায়ে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা দেশের বাজেট ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বড় ত্রুটি তুলে ধরে অর্থবছর পরিবর্তনের অভিনব প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে জুলাই-জুন অর্থবছর হওয়ার কারণে শুকনো মৌসুমে কাজের বরাদ্দ আসে না। বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে কাজ শুরু হয় এবং বৃষ্টির পানিতে বালু ও মাটি ধুয়ে নদী ভরাট হয়ে যায়। এর ফলে ফসল ও মৎস্য সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তিনি বলেন, “আমরা সংসদে প্রস্তাব দিয়েছি অর্থবছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর করার জন্য। এতে প্রথম ৯ মাস স্বাভাবিক গতিতে কাজ চলবে এবং শেষের তিন মাস রকেট গতিতে উন্নয়ন হবে। ফলে সম্পদের অপচয় রোধ হবে।”
নেত্রকোনার প্রাকৃতিক সম্পদের কথা উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, “এখানে সাদামাটির পাহাড়, সিলিকন বালু, কৃষিপণ্য ও মৎস্য সম্পদ রয়েছে। এগুলোকে কাজে লাগিয়ে এখানে শিল্পবিপ্লব ঘটাতে হবে।” তবে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, দুর্নীতি ও ঘুষের কারণে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সরকারকে শিল্পের প্রসারে ব্যবসায়ীদের জন্য দুর্নীতিমুক্ত ও বাধাহীন পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “যে দেশ আমাদের নাগরিকদের গুলি করে মারে, তারা আমাদের বন্ধু দেশ হতে পারে না।” এ বিষয়ে সংসদে নোটিশ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি হুশিয়ারি দেন, সরকার সমাধান না করলে বিজিবি’র পাশাপাশি দেশের সাধারণ মানুষ দেশপ্রেমের অস্ত্র বুকে ধারণ করে সীমান্তে গিয়ে দাঁড়াবে।
মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সরাসরি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে বলেন, “মাদকের সবচেয়ে বড় চালান আসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ির এলাকা দিয়ে। তিনি কি জানেন না এই চালান কীভাবে আসে এবং কারা এর সাথে জড়িত?” তিনি মাদকের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নয়, উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন ও সেবনের পথ চিরতরে বন্ধ করে ‘পুরোপুরি নির্মূল’ করার জোর দাবি জানান।
নিজের চাকরি জীবনের শুরুতে সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে (মধ্যনগর, জামালগঞ্জ) কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি দেশের প্রতিটি মানুষের কষ্ট বোঝেন। সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে তিনি স্পষ্ট জানান, সরকার ভালো কাজ করলে সমর্থন দেওয়া হবে, কিন্তু কোনো ভুল করলে তা ধরিয়ে দেওয়া হবে। সংশোধন না হলে জনগণের পক্ষে সংসদে বাঘের গর্জন শোনা যাবে। দেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
নেত্রকোনা জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ছাদেক আহমাদ হারিছের সভাপতিত্বে এবং জেলা সহকারী সেক্রেটারী ও প্রচার সম্পাদক জহিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ময়মনসিংহ অঞ্চল পরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সাহাবুদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম ভূঁইয়া।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনের সংসদ সদস্য মাসুম মোস্তফা, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা মাহবুবুর রহমান, জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি মাওলানা কামাল উদ্দিন এবং নেত্রকোনা পৌরসভা জামায়াতের নায়েবে আমীর ডা. আবুল হোসেন তালুকদারসহ জেলায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।
পড়ুন: ব্রয়লারের দাম কেজিতে ৩০ টাকা বাড়ল
আর/


