দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার দোহাজারী–রামু–কক্সবাজার রেলপথ এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ২০১০ সালের ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত একনেক সভায় “দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন গুন্দুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ” প্রকল্প অনুমোদন পায়।
২০১০ সালে অনুমোদিত এই মেগা প্রকল্পের মূল পরিকল্পনায় শুধু কক্সবাজার পর্যন্ত নয়, রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী গুন্দুম পর্যন্ত ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে রেললাইন নির্মাণের লক্ষ্যও ছিল।
তবে পরিবর্তিত বাস্তবতা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং আর্থিক বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত গুন্দুম অংশটি বাস্তবায়ন করা হয়নি।শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। পরবর্তীতে নকশা পরিবর্তন, প্রকল্প সংশোধন, সময় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও কারিগরি কারণে ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছে।
এই প্রকল্পের ইতিহাস শুধু একটি রেললাইন নির্মাণের নয়; এটি নীতিগত সিদ্ধান্ত, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ারও একটি উদাহরণ।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রকল্পে বিভিন্ন সময়ে একাধিক প্রকল্প পরিচালক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেন। তবে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিন প্রশাসনিক সমন্বয়, বাস্তবায়ন তদারকি এবং নীতিগত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিনের সময়েই প্রকল্পের বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং বাস্তবায়নের শেষ ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ জোরদার করা হয়। বিশেষ করে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সুবক্তগিনের সমন্বয়মূলক ভূমিকা সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনায় এসেছে।
একই সময়ে রামু–গুন্দুম অংশের প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবসম্মততা নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রকল্পের আর্থিক দিক বিবেচনায় ওই অংশ মূল প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়। তার এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের প্রায় ৬ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং প্রকল্পটি বাস্তবসম্মত কাঠামোর মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে দেশের অন্যতম আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন, একাধিক নতুন স্টেশন, শতাধিক সেতু ও কালভার্ট এবং অত্যাধুনিক রেল অবকাঠামো। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির নির্মাণকাজ দুটি প্যাকেজে সম্পন্ন হয়। ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে রেলপথটির উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পর্যটন নগরী কক্সবাজার সরাসরি রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়।
এই রেলপথ চালুর ফলে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কক্সবাজারে যাতায়াত সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন, পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে।
যদিও রামু–গুন্দুম অংশ আপাতত বাস্তবায়িত হয়নি, সংশ্লিষ্টরা মনে করেন ভবিষ্যতে মিয়ানমারের পরিস্থিতির উন্নতি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পুনরায় সেই পরিকল্পনা বিবেচনা করতে পারে।
দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ তাই শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের সফল সমাপ্তি নয়; এটি দীর্ঘ পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সমন্বয়, বাস্তবতার সঙ্গে নীতিগত অভিযোজন এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
পড়ুন: ডেঙ্গুর ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা: এডিসের লার্ভা তিনগুণ, সামনে কি বড় বিপদ?
আর/


