দেশজুড়ে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা করছেন কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, চলতি মৌসুমে রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। একই সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বাড়ায় দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে অতিরিক্ত চাপ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে শয্যার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। দুর্ঘটনাজনিত জটিল রোগের পাশাপাশি নানা ধরনের অসংক্রামক রোগীর চাপও বাড়ছে, যাদের অনেকেরই তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হচ্ছে।
রাজধানীর হাসপাতালগুলোতেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সেখানে হাম ও ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ব্যাপক চাপের মধ্যে কাজ করছেন।
দেশের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২ হাজার ৬০০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, হাম রোগীর পাশাপাশি প্রতিদিন নতুন ডেঙ্গু রোগীও ভর্তি হচ্ছেন। ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে দেশে কয়েক হাজার ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদদের মতে, রাজধানীর তুলনায় এবার ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তার বেশি হতে পারে। তাদের ধারণা, গ্রামাঞ্চলে এডিস মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
আইইডিসিআরের এক কীটতত্ত্ববিদ জানিয়েছেন, দেশব্যাপী এডিস মশার ঘনত্ব নির্ণয়ে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। তার মতে, মশা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
রাজশাহী নগরীতেও এডিস মশার প্রজনন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-বর্ষা জরিপে সেখানে এডিস সূচক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ঝুঁকিসীমার অনেক ওপরে পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে বর্ষায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সাবেক ও বর্তমান জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঢাকার বাইরের এলাকাগুলো এবার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং সেখানে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিক সমন্বয় সভা করা হয়েছে এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে এক লাখের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তী বছরগুলোতে ওঠানামা থাকলেও ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়, যখন তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়ায়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ও মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
বেড়েছে লার্ভার ঘনত্ব, বাড়ছে উদ্বেগ
বর্ষা মৌসুমকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও চলতি বছর এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জরিপ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের একটি গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব অন্যান্য বছরের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রুটো ইনডেক্স বা বিআই মানও অনেক এলাকায় স্বাভাবিক সীমার ওপরে রয়েছে, যা ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জরিপে নর্দমা, নালা, ফুলের টব, প্লাস্টিক পাত্র, ডাবের খোল এবং বাড়ির আশপাশে লার্ভার উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ ওয়ার্ডেই উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত মিলেছে।
অন্যদিকে উপকূলীয় কয়েকটি জেলাতেও এডিস মশার ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুকূল আবহাওয়া এবং বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে।
তবে গবেষকদের মতে, মূল সমস্যা হচ্ছে লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া। তাদের দাবি, স্থানীয় প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং দীর্ঘদিন ধরে মশক নিধন কার্যক্রমে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই লার্ভাগুলো ধ্বংস না করা গেলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধু ওষুধ ছিটানো নয়, বরং সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মশক নিধন কর্মসূচি প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার ও জনগণকে একসঙ্গে সম্পৃক্ত না করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।
পড়ুন: দেশজুড়ে আসছে শক্তিশালী বৃষ্টিবলয় ‘ধারা’, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার শঙ্কা
আর/


