রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবাড়ী বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ রাজবংশগুলোর একটি। এর ইতিহাস যেমন গৌরবময়, তেমনি তাদের তৈরি করা স্থাপত্যশৈলী আজও পর্যটকদের মুগ্ধ করে। মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত এই রাজবংশের শাসনকাল বিস্তৃত ছিল। কালের বিবর্তনে আজ শুধু পরিত্যক্ত ভবনের স্মৃতী পর্যটকদের মন কারে।
স্থানীয় প্রশাসনের সঠিক তদারকি না থাকায় রাজবাড়ীর অবশিষ্ঠ অংশ গুলো বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে। এই প্রাচীন স্থাপত্য রক্ষনাবেক্ষনের সরকারী অনুদান থাকলেও তার হদিস খুজে পাওয়া যায় না। পর্যটকদের মাধ্যমে সে সকল আয় আসে তাতেও দেখা দেয় অনিয়ম। বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারনে এই প্রাচীন রাজবাড়ীর জমি ক্রমশয় ছোট ছোট অংশে কমে যাচ্ছে। এই স্থাপনার স্থায়ী কোন নিরাপত্তা না থাকায় ভবনের বিভিন্ন অংশ প্রতিনিয়ত চুরি হচ্ছে।
রাজবংশের সূচনা (মোঘল আমল)
১৬শ শতাব্দীর শেষের দিকে (মতান্তরে ১৭শ শতাব্দীর শুরুতে) পুঠিয়া রাজবংশের গোড়াপত্তন হয়। এই বংশের আদি পুরুষ ছিলেন ভাৎসলাচার্য (বা বৎসরাজ), যিনি একজন বেদজ্ঞ পণ্ডিত ও তান্ত্রিক সাধক ছিলেন। মোঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ যখন বাংলায় আসেন, তখন ভাৎসলাচার্যের আধ্যাত্মিক শক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে পুঠিয়া এলাকার লস্করপুর পরগনার জমিদারী দান করেন।
তবে ভাৎসলাচার্য নিজে সংসারত্যাগী হওয়ায় জমিদারীর দায়িত্ব নেন তার ছেলে পীতাম্বর। তিনিই পুঠিয়া রাজবংশের প্রথম প্রকৃত জমিদার বা রাজা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। পীতাম্বরের মৃত্যুর পর তার ভাই নীলাম্বর এই অঞ্চলের দায়িত্ব পান এবং মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন।
পুঠিয়া রাজবাড়ী চত্বরের ঐতিহাসিক দোল মন্দির. জমিদারী ভাগ ও পাঁচআনি-চারআনি এস্টেট
১৭৪৪ সালে রাজা নারায়ণ রায়ের মৃত্যুর পর তার চার ছেলের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হয়ে যায়। জ্যেষ্ঠ পুত্র পান সম্পত্তির প্রায় সাড়ে পাঁচ আনা অংশ, যা ‘পাঁচআনি’ এস্টেট নামে পরিচিত হয়। বাকি তিন পুত্র মিলে পান সাড়ে চার আনা অংশ, যা ‘চারআনি’ এস্টেট নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানের মূল পুঠিয়া রাজবাড়ীটি মূলত এই পাঁচআনি রাজাদের তৈরি।
বর্তমান রাজবাড়ী ও রানী ভুবনময়ী
১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (মহা দুর্ভিক্ষ) এবং ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে পুঠিয়ার পুরনো অনেক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমান যে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর রাজপ্রাসাদটি দেখা যায়, সেটি ১৮৯৫ সালে রানী ভুবনময়ী দেবী তার শাশুড়ি মহারানী শরৎসুন্দরী দেবীর স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মাণ করেন।
পুঠিয়া রাজবংশের নারীরা, বিশেষ করে মহারানী শরৎসুন্দরী দেবী এবং রানী ভুবনময়ী, তাদের দানশীলতা, সমাজসেবা এবং ধর্মীয় কাজের জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন। তারা শুধু প্রাসাদই গড়েননি, পুরো এলাকা জুড়ে অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন মন্দির ও দীঘি খনন করিয়েছিলেন।
রাজবাড়ী চত্বরের বিখ্যাত গোবিন্দ মন্দির। রাজবাড়ীর মূল আকর্ষণ ও মন্দিরসমূহ
পুঠিয়া রাজবাড়ী চত্বরটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক মন্দির কমপ্লেক্সগুলোর একটি। এখানকার মূল আকর্ষণগুলো হলো পাঁচআনি রাজপ্রাসাদ। দ্বি-তল বিশিষ্ট মূল প্রাসাদ, যার সম্মুখভাগে বিশালাকার করিন্থিয়ান পিলার বা স্তম্ভ রয়েছে।
ভুবনময়ী শিব মন্দির- ১৮২৩ সালে নির্মিত এই মন্দিরটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম শিব মন্দির। এটি তার চমৎকার স্থাপত্যের জন্য পরিচিত।
গোবিন্দ মন্দির- পোড়ামাটির (টেরাকোটা) কারুকাজে মোড়ানো এই মন্দিরটিতে রামায়ণ ও মহাভারতের দৃশ্য খোদাই করা আছে। দোল মন্দির- চার তলা বিশিষ্ট এই সাদা রঙের মন্দিরটি দূর থেকেই সবার নজর কাড়ে। জগন্নাথ ও রথ মন্দির- রাজবাড়ির ঠিক পেছনেই এগুলো অবস্থিত।
রাজবংশের অবসান
১৯৫০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার ‘জমিদারী উচ্ছেদ ও প্রজাস্বত্ব আইন’ পাস করলে পুঠিয়া রাজবংশের প্রাতিষ্ঠানিক জমিদারী প্রথার অবসান ঘটে। এরপর রাজপরিবারের সদস্যরা ভারতে চলে যান। বর্তমানে এই পুরো এলাকাটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে।
রাজশাহী প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান পুঠিয়া প্রাচিন স্থাপত্য রাজবাড়ি নিয়ে বলেন, দৈনন্দিন রক্ষনাবেক্ষনের যে পরিমান বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটা যথাযথ অর্থ নই। তবু এই দপ্তর থেকে স্থায়িত্ব করতে সার্বিক চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজবাড়ীর জমি ক্রমশয় ছোট ছোট অংশে কমে যাচ্ছে এই বষিয়ে তিনি বলেন, সরকারী জমি কোনভাবে বেদখল হওয়ার সুযোগ নেই। এই রাজবাড়ি নিরাপত্তার বিষয়ে জানান, ২০ জন আনসার নিযুক্ত আছে তারা নিরপত্তার বিষয়ে কাজ করছে। সার্বিক কোন জটিলতা থাকলে স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে সমাধানের চেষ্ঠা করেন বলে জানান, রাজশাহী আঞ্চলিক পরিচালক, বগুড়া।
পড়ুন : সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
সা/


