বিজ্ঞাপন

২০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে শেরপুরে শিক্ষককে অপহরণ, নগদ টাকা না পেয়ে সাদা চেকে মুক্তি

শেরপুরের নকলায় এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষককে পিস্তল ঠেকিয়ে অপহরণ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষকের কাছ থেকে প্রথমে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এরপর অমানুষিক নির্যাতন এবং জোরপূর্বক সাদা ব্যাংক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে উঠেছে। এ ঘটনায় শেরপুর আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গত ৬ জুলাই ২০২৬ (সোমবার) ভুক্তভোগী শিক্ষক মোঃ শহীদুল ইসলাম (৫২) বাদী হয়ে শেরপুরের বিজ্ঞ সি.আর. আমলি আদালত, নকলায় এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামিরা হলেন—নকলা উপজেলার পিঁপড়িকান্দি গ্রামের মোঃ আবু সাঈম মির্জা (৩৫), মেদীরপাড় গ্রামের মোঃ জাহাঙ্গীর আলম গেন্দু মিয়া (৪৫) এবং বাউসা গ্রামের মোঃ লিটন মিয়া (৩৬)। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৬/৭ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার বাদী মোঃ শহীদুল ইসলাম নকলা উপজেলার বড়ইতার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর সহধর্মিণী শরুীফা বেগমও একই উপজেলার মেদীরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত আছেন।এই মামলায় অভিযুক্ত তিন আসামি বর্তমান সরকার দলীয় দলের সাথে সক্রিয় রাজনীতি জড়িত।

মামলার আরজি ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, মামলার বাদী মোঃ শহীদুল ইসলাম কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের পদে ছিলেন না কিন্তু আওয়ামী লীগ সাপোর্ট করতেন। তবে সরকারি চাকরি করার কারণে গত দুই বছর ধরে এলাকার বিএনপি নেতারা বলতো তিনি সরকারি দলের সমর্থক। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সরকারি চাকরিজীবী হওয়ায় ওই নেতারা তাঁদের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন এবং প্রায় দেড়-দুই বছর ধরে কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে টাকা দাবি করে আসছিলেন। অপহরণকারী ভুক্তভোগী নাগরিককে টিভিকে জানান, গত ৩ জুলাই শুক্রবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে শিক্ষক শহীদুল ইসলাম গ্রামের বাড়ি থেকে শেরপুর সদরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে খারজান বাজারের উত্তর পাশে একটি অটোরিকশায় উঠলে আসামিরা তাঁর গতিরোধ করে। এ সময় আসামিদের মধ্যে পরিচিত সাঈমসহ ৫-৭ জন তাঁকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক মোটরসাইকেলে তুলে চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলে। ভুক্তভোগীর বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে ২০ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং গণপদ্দী ও ভীমগঞ্জসহ বিভিন্ন অজ্ঞাত স্থানে ঘুরিয়ে জিম্মি করে রাখা হয়। নির্যাতন, ইয়াবা সেবনের চেষ্টা ও মধ্যরাতে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ অপহৃত শিক্ষক নগদ টাকা দিতে ব্যর্থ হলে আসামিরা লোহার রড ও লাঠিসোটা দিয়ে তাঁকে এলোপাতাড়ি মারধর করে শরীরে মারাত্মক জখম করে। তাঁর দাড়ি ধরে টানা-হেঁচড়া করা হয় এবং জোরপূর্বক ইয়াবা সেবন করানোরও চেষ্টা করা হয়। রাত আড়াইটার দিকে অপহরণকারীরা শিক্ষকের স্ত্রীর ফোনে কল করে প্রথমে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং হুমকি দেয়—টাকা না দিলে গলায় ছুরি চালিয়ে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দী করে ফেলে দেওয়া হবে। তারা শিক্ষকের স্ত্রীকে টাকা নিয়ে আসতে বলে, কিন্তু গভীর রাতে একজন নারীর পক্ষে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়।

একপর্যায়ে প্রাণের ভয়ে শিক্ষক তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে আসামিদের ব্যাংক চেক দিতে রাজি হন। অপহরণকারীরা পরবর্তীতে জানতে পারে, ভুক্তভোগী পরিবার মুহব্বত চেয়ারম্যানের বাড়িতে ভাড়া থাকে। রাত প্রায় ৩টা ২৫ মিনিটে অপহরণকারীরা চেয়ারম্যানের বাড়িতে যায়। চেয়ারম্যান তাদের বসিয়ে আপ্যায়ন করান। সেখানে সোনালী ব্যাংক নকলা শাখার ভুক্তভোগীর একটি অলিখিত চেক ও ৫০ টাকার দুটিসহ মোট ৪/৫টি অলিখিত স্ট্যাম্প নিয়ে তাদের অপহরণকৃত স্থানে বন্দী ভুক্তভোগী শিক্ষকের গলায় ছুরি ধরে জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায় করা হয়। অবশেষে ৪ জুলাই ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে অভিযুক্তরা শিক্ষক শহীদুল ইসলামকে চোখ বাঁধা অবস্থায় গণপদ্দী বাজারে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

সকাল ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।ভুক্তভোগীর পরিবার জানান, ঘটনার রাতে ভুক্তভোগীর কোনো সন্ধান না পেয়ে তাঁরা নকলা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত এএসআই এমদাদ জিডি নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি কখনো বলেন কম্পিউটার নষ্ট, কখনো বলেন প্রিন্টার নষ্ট। পুলিশকে তদন্তের অনুরোধ করা হলে এএসআই এমদাদ বলেন, “সবাই ঘুমিয়ে আছে, ভোরে আর্জেন্টিনার খেলা আছে, তাই এখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।”

পরে অন্য থানায় কর্মরত ভুক্তভোগীর এক জ্যাঠাতো ভাই (যিনি একজন এসআই) ফোন করলে নকলা থানায় শুধু ডায়েরিতে একটি নোট করে রাখা হয় এবং সকালে ১০টায় আসতে বলা হয়। এরপর নকলা থানার ওসিকে ফোন করা হলেও তিনি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। ৫ জুলাই হাসপাতাল থেকে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে গেলে পুলিশ প্রভাবশালী মহলের তদবিরে সেটি গ্রহণ না করে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়, যা ভুক্তভোগী মামলার অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।

থানায় কোনো সহযোগিতা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী পরিবার আদালতের দ্বারস্থ হয়। বিজ্ঞ আদালতে দণ্ডবিধির ১৪৩/৩৬৪/৩৪২/৩৮৫/৩৮৬/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৫০৬(২)/৩৪ ধারায় অপরাধ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে জানার জন্য বাড়িওয়ালা মহব্বত চেয়ারম্যানকে বার বার ফোন করা হলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। আসামি সাঈমকে মুঠোফোন whatsapp এ কয়েক বার ফোন করা হলে রিসিভ করেনি।

এবিষয়ে এএসআই এমদাদকে মুঠোফোন বিষয়টি বললে তিনি বলেন, আমাকে পরে ফোন দেন পরবর্তীতে তার whatsapp যোগাযোগ করা হলে রিসিভ করেনি।

বিষয়টি নকলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রিপন চন্দ্র গোপ বলেন, আসামি ও বাদী তাদের মাঝে পূর্ব থেকে ব্যক্তিগত ঝামেলা ছিলো। বাদী আমাদের পুলিশ সম্পর্কে যে নেগেটিভ তথ্য দিয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভূল বলেছে। আমরা সবসময় জনগনের সেবায় নিয়োজিত। সেদিন রাতে আসার পরদিন সকালে আসতে বলা হলে আসেনি পরবর্তীতে জেনেছি কোর্টে মামলা করেছে। মামলার তদন্তে আমরা স্বচ্ছ ও সত্যি বিষয়টা তুলে ধরবো।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে: ডিসি ফরিদা

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন