পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় জমি দখলে নিতে তৈরী করা হয় অস্থায়ী মন্দির। পরে জমি বিরোধে প্রতিপক্ষকে মারধর করে সেই মূর্তি ভেঙে সাজানো হয় ভিন্ন ঘটনা। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এমনি তথ্য উঠে এসেছে। গত বুধবার বিকেলে উপজেলার ধামোর ইউনিয়নের জুগিকাটা এলাকায় এঘটনাটি ঘটে।
তবে কালীমূর্তির নেপথ্যে আরো ভিন্ন কাহিনী পাওয়া গেছে। পুলিশও এ ঘটনার সত্যতা খুঁজে পায়নি। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই ঘটনার সূত্রপাত বলে জানিয়েছে তারা। সনাতন ধর্মালম্বীদের একটি পক্ষ মুসলিমদের বিরুদ্ধে কালীমূর্তি ভাঙার অভিযোগ তুললেও সনাতন ধর্মালম্বী আরেকটি পক্ষের দাবি অভিযোগকারীরাই ভেঙেছে মূর্তি, করেছে মুসলিম ব্যক্তিকেই মারধর। এ ঘটনায় ওই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, ওই এলাকার অনিল চন্দ্র রায়ের পরিবার ও লক্ষ্মীচরণ রায়ের পরিবারে মধ্যে ৬ একর ৬৬ শতক জমি নিয়ে বিরোধ দীর্ঘদিনের। জমিটি গেলো বছর লক্ষ্মীচরণ স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেনের কাছে বিক্রি করেন। পরে এনিয়ে আদালতে মামলাও চলমান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অভিযোগ করা হলে তিনি উভয়পক্ষকে নিয়ে আগামী ১২ জুলাই আপোষে বসার সময় নির্ধারণ করেন। এরই মধ্যে উভয়পক্ষকে জমিতে যেতে নিষেধ করা হয়। কিন্তু অনিল ও তার লোকজন বুধবার দুপুরে বিরোধীয় জমিতে চাষ করতে গেলে জাকির ও তার ভাই জুলকার রানা বাধা দেয়। এসময় অনিল ও তার পরিবারের লোকজন জাকিরকে আটক করে মারধর করে। এক পর্যায়ে জমির বাঁশ বাগানের সাথে থাকা কালীমূর্তি ৬ মাস আগে নির্মিত তারা নিজেরাই ভেঙে জাকিরের গলায় ও হাতে ধরিয়ে দিয়ে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ছড়িয়ে দেয় বলে দাবি পুলিশের। এক পর্যায়ে জাকিরকে টেনে হিচঁড়ে রাস্তায় নিয়ে ফেলে দেয় তারা। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে আটোয়ারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেয়া হয়। এদিকে, রাতে দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ও প্রশাসন পরিস্থিতি শান্ত করে পুলিশ মোতায়েন করে।
লক্ষ্মীচরণের স্ত্রী শেফালী রানী বলেন, অনিলরা আগে জাকিরকে প্রচুর মারধর করে। পরে তারাই কালীমূর্তি ভেঙে নাটক সাজিয়েছে। ওই স্থানে কয়েক মাস আগে ঠাকুরঘর তুলে তারা কালীমূর্তি রাখে। তারা অপরাধ করে মুসলিমদের দোষ দেয়ার চেষ্টা করছে।
জাকির হোসেনের ভাই জুলকার রানা বলেন, ইউএনও নিষেধ করার পরও তারা জমিতে চাষ দিতে গেলে আমরা দুই ভাই গিয়ে বাধা দেই। তারা দৌড়ে এসে আমাদের উপর হামলা করে। আমার ভাইকে তারা কয়েকজনের মিলে মারধর করে পা ভেঙে দিয়েছে। পরে তারা নিজেরাই মূর্তি ভেঙে ভিডিও ধারণ করে গুজব ছড়ায়। ভিডিওটি ভালো করে দেখলেই বোঝা যাবে যে এটা তাদের সাজানো। আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তারা জমিটি দখল করার জন্য কয়েক মাস আগে সেখানে মূর্তি ও খড় দিয়ে ছোট্ট একটি ঘর তোলে। তাদের এই গুজব ও হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে তারা বার বার এমন ঘটনা ঘটাবে।
আরেকপক্ষ অনিলের ভাই কান্তপাল রায় বলেন, আমরা জমিতে চাষ দিতে গেলে জাকির বাঁধা দেয়। সে আমাদের কালীমূর্তি ভেঙে ফেলে। পরে আমরা ধরে তাকে লাঠি দিয়ে দুটো ডাং দিয়েছি। এদিকে রাতে আমাদের ঘরবাড়িতে দুই তিনশো মানুষ হামলা করেছে। ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী থানার (ওসি) মতিয়ার রহমান বলেন, এটি কোন সাম্প্রদায়িক ইস্যু নয়। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই ঘটনা। মুসলিম যুবকের হাতে কালীমূর্তি ভাঙার যে দাবি করা হচ্ছে তার সত্যতা পাই নি আমরা। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে। ওই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী বলেন, তাদের উভয় পক্ষকে নিয়ে ১২ জুলাই মিমাংসা বা সমাধানে বসার কথা ছিল। এর আগে উভয় পক্ষই মারামারিতে জড়ায়। আমরা সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে পুলিশ মোতায়েন করেছি। আপাতত সব স্বাভাবিক। কোন সমস্যা নেই।
এদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে উপজেলা নির্বাহীর কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনীল চন্দ্র ও লক্ষীচরণ ও জাকিরের লোকজনকে নিয়ে সমাধানে বসা হয়। পরে আটোয়ারী প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের মধ্যে বিরোধ মিমাংসার কথা জানান তারা।
পড়ুন : খুলনা জেলা কারাগার থেকে হাজতির পলায়ন, ফেরাতে অভিযান চলছে


