যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পিরোজপুরে পালিত হয়েছে জুলাই শহীদ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা ও স্মরণানুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সকাল ১০টায় পিরোজপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পার্শ্ববর্তী জুলাই স্মৃতি স্তম্ভে জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে প্রথমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরে পর্যায়ক্রমে পুলিশ প্রশাসন, জেলা পরিষদ, জেলা বিএনপি, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জুলাই শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জুলাই যোদ্ধা, সাংবাদিক এবং সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় বক্তারা বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তাঁদের আত্মত্যাগের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল সকল ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠন। তিনি বলেন, জুলাইয়ের শিক্ষা ও চেতনা কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনা কিংবা সভাকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে।
তিনি বলেন, “অভ্যুত্থান কেন হয়েছিল? বাংলাদেশের মানুষ কি বারবার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দেবে? রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী?”—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা পরিহার করে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে।
জেলা প্রশাসক জানান, পিরোজপুর জেলায় জুলাই শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের গেজেট যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত ১১৯ জনের নাম গেজেটভুক্ত হয়েছে। যাচাইয়ের জন্য প্রাপ্ত ১০১টি নামের মধ্যে একটি নাম একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত থাকায় কার্যকরভাবে ১০০টি নাম যাচাই করা হয়েছে। অবশিষ্ট ১৮টি নাম এখনও যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া নতুন চার থেকে পাঁচটি আবেদনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, যাচাই-বাছাই শেষে ১০ জনের তথ্য নিয়ে আপত্তি ওঠে। এর মধ্যে ৯ জনের গেজেট বাতিল করা হয়েছে এবং একজনের তথ্য অধিকতর যাচাইয়ের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা নন—এমন কেউ যেন কোনোভাবেই গেজেটভুক্ত না হন। এ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নির্ভুল রাখতে প্রকৃত জুলাই যোদ্ধাদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সরকার জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসনে কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মতো জুলাই যোদ্ধাদের পাশেও জেলা প্রশাসন অতীতে ছিল, বর্তমানে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বিভেদ নয়, বরং ঐক্য, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা। তাই ব্যক্তি, দল বা সমাজ—কোনো ক্ষেত্রেই বিভক্তি নয়, ঐক্যই হতে হবে আমাদের প্রধান শক্তি।
শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে জেলা প্রশাসক বলেন, “আবু সাঈদেরও বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ন্যায়, অধিকার ও আদর্শের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।” তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি সবাইকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও আদর্শ ধারণ করে দায়িত্ব, সততা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সুশাসনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি বৈষম্যহীন, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি শহীদ পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং উপস্থিত অতিথি, সাংবাদিক, শিক্ষক ও অংশগ্রহণকারী সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

