ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সূর্যাস্তের পরও থামেনি আন্দোলনের উত্তাপ। সোমবার (২০ জুলাই) দিনভর মধ্য দিল্লিতে চলা বিক্ষোভ রাতেও অব্যাহত থাকে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে হাজারো আন্দোলনকারী পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনীর বাধার মুখে তারা পিছু হটলেও কয়েক ঘণ্টা পর আবারও জড়ো হয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট এ তথ্য জানিয়েছে।
জন্তর মন্তর এলাকাজুড়ে বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুর উপস্থিতিতে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো পরিবেশ। রাত সাড়ে ৮টার দিকে জনপথ রোডে উল্টে থাকা দিল্লি পুলিশের একটি ব্যারিকেডের ওপর উঠে ১০ থেকে ১৫ জন যুবক ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেন। নিচে অবস্থান নেওয়া হাজারো বিক্ষোভকারী করতালি, বাঁশি ও বিভিন্ন স্লোগানে তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। অন্য একটি অংশ থেকে শোনা যায়, ‘লড়েঙ্গে, জিতেঙ্গে’ ধ্বনি।
দ্য প্রিন্টের ভাষ্য অনুযায়ী, এ দৃশ্যটি দিনের শুরুতে ঘটে যাওয়া ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত। এর প্রায় ১২ ঘণ্টা আগে একই আন্দোলনকারীরা পার্লামেন্টমুখী মিছিলের সময় পুলিশের বলপ্রয়োগের মুখে পড়েন। সেই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এক বিক্ষোভকারী চিৎকার করে বলেন, ‘কতজনকে মারবে? আমরা বাড়ি ফিরে যাব না।’
আন্দোলনস্থল জন্তর মন্তর পুরোপুরি ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রেখেছে দিল্লি পুলিশ। কেবল ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সদস্যদের কেরালা ভবনের কাছে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্যদের প্রবেশ সীমিত থাকলেও বাইরে মানুষের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়তে থাকে। ‘জিন্দাবাদ’ ও ‘নেহি চলেগি, নেহি চলেগি’ স্লোগানের পাশাপাশি অনেককে ভারতের জাতীয় পতাকা ও বি. আর. আম্বেদকরের ছবি হাতে দেখা যায়।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা অবস্থায় একটি বেঞ্চে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ২০ বছর বয়সি ভিডিও এডিটর মোহাম্মদ আয়ান। তিনি জানান, ইন্ডিয়া গেটের কাছে মিছিলে অংশ নেওয়ার সময় পুলিশ অভিযান চালালে একটি কাঁদানে গ্যাসের শেল তার মাথায় আঘাত করে। চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আবারও জন্তর মন্তরে ফিরে আসেন।
আয়ানের ভাষায়, ‘অল্প কিছুদূর হাঁটার পরই পুলিশ জনতার ওপর চড়াও হয়। আমি দৌড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আহত হই। একটি কাঁদানে গ্যাসের শেল আমার মাথায় লাগে। তখন শ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার বাবার বয়সী মানুষদের মার খেতে ও আহত হতে দেখেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন চলে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। আজ পাশে না দাঁড়ালে কে দাঁড়াবে? সরকারকে জানিয়ে দিতে চাই, আমরা বাড়ি ফিরব না। এখানেই অবস্থান করব।’
অনেক আন্দোলনকারীর মতে, সোমবার পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার বদলে বিক্ষোভ আরও জোরদার হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মউ থেকে আসা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থী শ্রেয়াংশ চন্দ্র ভাস্কর জানান, এটি তার সপ্তমবারের মতো এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ। তার ভাষায়, সোমবার সেখানে থাকা তার জন্য জরুরি ছিল।
মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট ও পোস্টার হাতে মানুষের ভিড়ের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘আপনি কি জানেন কেন এত মানুষ ফিরে এসেছে? কারণ আমরা আর ভয় পাই না। জবাবদিহি চাইলে যারা আমাদের শাস্তি দেয়, তাদের আমরা ভয় করি না। আমরা এখানেই থাকব।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ যখন আমাদের ওপর লাঠিচার্জ করল এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ল, তখনই আমাদের ভয় কেটে গেছে। আমরা আহতদের রক্ষা করার চেষ্টা করছিলাম।’
আন্দোলনস্থলে বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ ছিল স্পষ্ট। একের পর এক স্লোগান চলছিল, যদিও প্ল্যাকার্ড ধরা অনেক হাতেই ক্লান্তির ছাপ দেখা গেছে। চারপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও আন্দোলনকারীরা লাইভস্ট্রিম চালিয়ে যান। মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইটে আলোকিত হয়ে থাকে পুরো সমাবেশস্থল।
২৪ বছর বয়সি কবি ও লেখক দিবাকর লিহাজের মতে, এ দিনের সহিংসতা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে। তিনি বলেন, ‘আজ যা ঘটেছে, তার পরও আমি ফিরে এসেছি। কারণ সব সীমা অতিক্রম করা হয়েছে। আজকের তরুণরা জবাবদিহি চায়। তাদের সরিয়ে দেওয়া যাবে না। তারা আবারও ফিরবে, আরও শক্তিশালী হয়ে।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা যা ঘটেছে তার জবাব না দেওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।’
তবে এ পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার কথাও জানান দিবাকর লিহাজ। তার মতে, জনগণের সরকার হয়েও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ভীত। আজ যা ঘটেছে, তা হওয়া উচিত ছিল না। সরকার আমাদের জন্য, তাহলে এত দূরত্ব কেন? সরকারের সঙ্গে কথা বলার জন্যই যদি আন্দোলন করতে হয়, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’
পড়ুন: বিশ্বকাপ জয় নেইমারকে উৎসর্গ করলেন নিকো উইলিয়ামস
আর/


