বিজ্ঞাপন

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে কৃষকদের মাথায় হাত

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে মানিকগঞ্জজুড়ে কৃষকের স্বপ্ন যেন পানিতে ভেসে গেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গিয়ে কাঁচামরিচ, পেঁপে, বোনা আমন ও বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফসল ঘরে তোলার আগেই ক্ষেত ডুবে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো কৃষক।

বিজ্ঞাপন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ দুর্যোগে জেলার ২২২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ৪ হাজার ৮৮৫ জন কৃষক। প্রাথমিকভাবে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় মরিচগাছ পচে যাচ্ছে, পেঁপে গাছের গোড়া নষ্ট হচ্ছে এবং সবজিক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচামরিচ, পেঁপে, বোনা আমন ও বিভিন্ন মৌসুমি সবজির আবাদ। জেলার সাটুরিয়া, ঘিওর, শিবালয়, দৌলতপুর,হরিরামপুর, সিংগাইর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতির চিত্র সবচেয়ে বেশি।

সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে অধিকাংশ কৃষিজমিতে পানি জমে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মরিচ চাষিরা। জমিতে পানি জমে থাকায় মরিচগাছের শিকড় পচে অধিকাংশ গাছ মারা গেছে। পরিপক্ব ভুট্টা মাঠ থেকে ঘরে তুলতে না পারায় তা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সবজিক্ষেতের মাচা ভেঙে পড়েছে, ফলে সবজিগাছও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পাটগাছের গোড়া নরম হয়ে পড়ে যাওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের আশায় অনেকেই ঋণ ও ধারদেনা করে চাষাবাদ করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ আচরণে ফসল ঘরে তোলার আগেই সব আশা ভেঙে পড়েছে। ক্ষেতের পর ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে সংসারের খরচ চালানো তো দূরের কথা, নতুন করে আবাদ শুরু করাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দ্রুত সরকারি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে বলে জানান তারা।

সদর উপজেলার নবগ্রাম এলাকার কৃষক আজাদ হোসেন বলেন, “কয়েক দিনের বৃষ্টিতে আমাদের প্রায় সব ফসলের খেত নষ্ট হয়ে গেছে। মরিচের দাম বাড়তে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই খেত ডুবে গেল। বর্ষার পর আবার চাষ করব, সেই টাকাও এখন হাতে নেই।”

ঘিওর উপজেলার বাঠইমুড়ি গ্রামের মরিচ চাষি আব্দুল হাই বলেন, “দুই বিঘা জমিতে মরিচ চাষ করেছিলাম। ফলনও ভালো ছিল। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে পুরো খেত নষ্ট হয়ে গেছে। পেঁয়াজে আগেই লোকসান হয়েছে, এখন মরিচেও ক্ষতি হলো। আবার পাটের গোড়াও নরম হয়ে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে।”

নয়াচর এলাকার কৃষক সোলায়মান বলেন, “ঋণ করে চার বিঘা জমিতে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ করেছি। গাছে প্রচুর মরিচ ধরেছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে পানি জমে সব গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।”

সবজি বিক্রেতা ইমরান মিয়া বলেন, “মাঠ থেকে আড়তে মরিচ ও সবজির সরবরাহ অনেক কমে গেছে। পাইকারি বাজারেই দাম বেড়ে গেছে। তাই বেশি দামে কিনে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।”

টানা বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ কাঁচামরিচের মোকাম ঝিটকা বাজারেও। বাজার সমিতির সহ-সভাপতি মোহাম্মদ বাবুল হোসেন বলেন, “কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অধিকাংশ মরিচক্ষেতে পানি জমে গেছে। ফলে বাজারে কাঁচামরিচের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে এ মৌসুমে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫ হাজার মণ কাঁচামরিচ বেচাকেনা হতো। এখন বাজারে উঠছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মণ। এতে কৃষকের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।”

মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাজাহান সিরাজ বলেন, “টানা বৃষ্টিতে জেলার ২২২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে, যাতে তারা সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।”

তিনি আরও জানান, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শুরু করেছেন। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং দ্রুত পুনরায় চাষাবাদে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

পড়ুন : মোজাফফর হোসেনকে বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ

সা/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন