সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা হিসেবে তারই ছিল।
“আমি নিজেই এ কথা একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছি। তাই এতোদিন পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিষয়টি তদন্ত করে তা প্রকাশের কি এমন কারণ ঘটলো বুঝলাম না,” নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় লিখেছেন তিনি।
এর আগে আজই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একটি তদন্ত কমিটি ওই ঘটনার ওপর তাদের তদন্ত শেষ করে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, ওই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়ার দায় আসিফ নজরুলের।
জবাবে মি. নজরুল লিখেছেন, “ঘটনার সূত্রপাত উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের চাপের মুখে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অপমানজনকভাবে বাদ দেওয়া থেকে। এর পরপরই আমরা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা এবং বাংলাদেশের প্রতি অবমাননার প্রতিবাদে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার বিষয়ে অনীহা জানাই”।
“আমাদের আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, আইসিসির প্রথম রিপোর্টেই তার স্বীকৃতি ছিল। সেখানে ভারতে নিরাপত্তা-আশঙ্কার তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল-বিশ্বকাপের দলে মুস্তাফিজ থাকলে, বাংলাদেশের সমর্থকরা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করলে এবং বাংলাদেশে নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে। বিবিসি বাংলা ওই রিপোর্টের হুবহু বাংলা অনুবাদও প্রকাশ করেছিল,” লিখেছেন তিনি।
আসিফ নজরুল লিখেছেন, “আমরা শেষ পর্যন্ত অন্য কোনো ভেন্যুতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য বহু চেষ্টা করেছি। কোনো কোনো দেশ থেকে সমর্থনও পেয়েছিলাম। কিন্তু সম্ভবত আইসিসির নেতৃত্বে ভারতীয়দের আধিপত্যে থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদেরকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও কোনো যোগাযোগ করা হয়নি”।
“আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনে তিনটি বিষয় ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার—দেশের মর্যাদা, আমাদের ক্রিকেটার-সাংবাদিক-সমর্থকদের নিরাপত্তা এবং আগামী নির্বাচনের আগে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। সে সময় বলা হয়েছিল, বিশ্বকাপ না খেললে বিদেশি দলগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা বন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডের নানা উদ্যোগে সেই আশঙ্কাও শেষ পর্যন্ত দূর হয়েছিল। আমি মনে করি, আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম,” লিখেছেন তিনি।
তার দাবি, “একটি ছোট দেশ বলে কেউ আমাদের ইচ্ছেমতো অপমান করবে, আর আমরা সবসময় তা মুখ বুঝে মেনে নিবো এমন প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। আমি সমমর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে বন্ধুত্বে বিশ্বাসী । মাথা নত করে সব মেনে নেয়াতে না”।
এদিকে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল বাংলাদেশ। পরে বাংলাদেশকে বাদ দিয়েই বিশ্বকাপ মাঠে গড়ায়। বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে দায়ী করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন এই উপদেষ্টার সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ না খেলা নিয়ে দেশের ভেতরেই বিস্তর আলোচনা সমালোচনা ছিল। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেছিলেন অনেকেই। ভারতে খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পেছনের কারণ অনুসন্ধানে বিস্তারিত তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
এ জন্য চলতি বছরের মার্চে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অণুবিভাগ) কে এম অলিউল্ল্যাকে আহ্বায়ক এবং জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন ও আইনজীবী ফয়সাল দস্তগীরকে নিয়ে তিন সদস্যের কারণ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়।
দীর্ঘ কয়েক মাসের তদন্ত শেষে ৩ সদস্যের সেই কমিটি আজ (মঙ্গলবার) ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তদন্তে যা উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও সবকিছু মিলিয়ে যা বলা যায়, যে মানুষটি দায়ী (বিশ্বকাপে না যাওয়ার জন্য), তিনি হলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপেদষ্টা আসিফ নজরুল। সেই সময়ের সরকার ও তিনি দায়ী।’
তদন্ত কমিটির এই প্রতিনিধি আরও জানান, ‘অবশ্যই বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলতে যাওয়া উচিত ছিল।’
তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং তাদের বক্তব্য যুক্ত করা হয়েছে। ক্রিকেটারদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। এ ছাড়া সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদ সৈয়দ আশরাফুল হক ছাড়াও ওই সময়ে বিসিবিতে থাকা আরও বেশ কয়েকজনের। পাশাপাশি গণমাধ্যমের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধিরও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল; তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য নিতে পারেনি বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি।
পড়ুন : উত্তর কোরিয়া এবার নাস্তানাবুদ করেছে বাংলাদেশকে


