বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘মহানায়ক’ নামে চিরস্মরণীয় কিংবদন্তি অভিনেতা উত্তম কুমারের আজ (২৫ জুলাই) মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮০ সালের এই দিনে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁর জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। সময়ের সঙ্গে প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত।
উত্তম কুমারের প্রকৃত নাম ছিল অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ভবানীপুরে তাঁর জন্ম। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় ও মা চপলা দেবীর সংসারে বড় ছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই দায়িত্বশীল জীবন কাটাতে হয়েছে তাঁকে। পরিবারের আর্থিক সংকট সামাল দিতে ১৯৪৬ সালে কলকাতা বন্দরে কেরানির চাকরিতে যোগ দেন। সে সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল ২৭৫ টাকা। তবে চাকরির পাশাপাশি অভিনয়ের স্বপ্নকে কখনো বিসর্জন দেননি। থিয়েটারে নিয়মিত কাজ করার পাশাপাশি চলচ্চিত্রে সুযোগের জন্যও চেষ্টা চালিয়ে যান।
১৯৪৭ সালে এক বন্ধুর সহায়তায় ‘মায়াডোর’ নামে একটি হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। যদিও ছবিটি মুক্তি পায়নি। এরপর ‘দৃষ্টিদান’ ছিল তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র, যেখানে তিনি নিজের আসল নাম ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। পরবর্তী সময়ে ‘কামনা’সহ কয়েকটি ছবিও ব্যর্থ হয়। এমনকি তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘উত্তম চ্যাটার্জি’ এবং পরে ‘অরূপ কুমার’ নামেও অভিনয় করেন। তবুও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য ধরা দেয়নি।
বারবার ব্যর্থতা, সমালোচনা ও উপহাসের মুখোমুখি হলেও তিনি অভিনয় ছেড়ে দেননি। অবশেষে ‘বসু পরিবার’ ছবির মাধ্যমে দর্শকের নজর কাড়েন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত সিনেমায় অভিনয় করে তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। পরে দর্শকের ভালোবাসায় তিনি হয়ে ওঠেন ‘মহানায়ক’।
১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া অভিনয়জীবনে টানা তিন দশকেরও বেশি সময় বাংলা চলচ্চিত্রে রাজত্ব করেছেন উত্তম কুমার। স্বাভাবিক অভিনয়, নিখুঁত সংলাপ, পরিমিত অভিব্যক্তি এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি শুধু প্রেমের নায়ক ছিলেন না; চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, শিল্পপতি, বিজ্ঞানীসহ নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
চলচ্চিত্র গবেষকদের মতে, উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল বাস্তব জীবনের সঙ্গে তাঁর চরিত্রগুলোর গভীর সংযোগ। তাঁর অভিনীত সিনেমাগুলোতে প্রেমের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত মানুষের সংগ্রাম, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক বৈষম্য ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে তাঁর সিনেমা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও সমানভাবে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য।
‘উত্তম কুমার: আ লাইফ ইন সিনেমা’ গ্রন্থে লেখক সায়নদেব চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, উত্তম কুমারের অভিনয়ের মধ্য দিয়েই বাংলা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে আধুনিকতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো শুধু বিনোদন দেয়নি, বরং সমাজ, নৈতিকতা, আত্মসম্মান ও মানবিকতার বার্তাও পৌঁছে দিয়েছে।
মৃত্যুর ৪৭ বছর পরও টেলিভিশনে তাঁর কোনো সিনেমা প্রচার হলে দর্শকের আগ্রহের কমতি দেখা যায় না। নতুন প্রজন্মও তাঁর অভিনয়, সংলাপ ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়। মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গন ও অসংখ্য ভক্ত গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন এই মহানায়ককে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে উত্তম কুমার শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি এক অনন্য সাংস্কৃতিক প্রতীক, যার অভিনয় ও অবদান যুগের পর যুগ দর্শকদের অনুপ্রাণিত করে যাবে।
পড়ুন:ভারতের শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিলেন অভিনেতা মাধবন
ইমি/


