পৃথিবীটা কি শুধু মানুষের? উত্তরটা নিশ্চয়ই না। মানুষের পাশাপাশি এই গ্রহে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে অসংখ্য প্রাণীরও। অথচ মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে তাদের নিরাপদ আবাসস্থল। বন উজাড়, নির্বিচারে নিধন, পাচার, পরিবেশদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক প্রাণী আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।
প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রাণী। মানুষের জীবন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। প্রাণীদের অধিকার রক্ষা, কল্যাণ এবং তাদের প্রতি মানুষের সদয় আচরণের বার্তা নিয়ে প্রতিবছর ৪ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব প্রাণী দিবস।
এবার ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘See the World Through Their Eyes’—অর্থাৎ ‘ওদের চোখে পৃথিবীকে দেখো’।
১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে পরিবেশবিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্বে দিবসটি পালন করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক নেচার ওয়াচ ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া প্রাণী কল্যাণমূলক বিভিন্ন সংস্থাও দিবসটি পালন করে থাকে।
বিশ্ব প্রাণী দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো প্রাণীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি উপলক্ষে প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা, সচেতনতামূলক প্রচার, অসুস্থ ও আহত প্রাণীর চিকিৎসা এবং প্রাণী সুরক্ষায় নানা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়।
মানবসভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে প্রাণীর সহাবস্থানের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। হাজার বছর আগে মানুষ কুকুরকে শিকারের সঙ্গী করেছে, গরু-মহিষকে কৃষিকাজে ব্যবহার করেছে। কৃষি থেকে পরিবহন, খাদ্য থেকে অর্থনীতি—মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রাণিকুল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশেও প্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব অনেক। সুন্দরবনসহ দেশের বনাঞ্চল, নদী, হাওর, বিল ও জলাভূমিতে রয়েছে অসংখ্য প্রাণী ও পাখির আবাস। রয়েল বেঙ্গল বাঘ, হরিণ, বানর, কুমির, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপ দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলার কৃষিজীবন, দুধ-ডিম-মাংসের পুষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বড় একটি অংশ আজও গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির ওপর নির্ভরশীল। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটিও শুধু খাদ্যাভ্যাসের পরিচয় নয়; এটি নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সম্পর্কেরও প্রতিফলন।
তবে এই সহাবস্থান দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। বন ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট, নদীদূষণ, শিকার ও অবৈধ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের কারণে দেশের অনেক প্রাণীও হুমকির মুখে রয়েছে। শহরাঞ্চলে কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীও মানুষের নিষ্ঠুরতা ও অবহেলার শিকার হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণী সুরক্ষায় শুধু আইন করলেই হবে না, প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। কোনো প্রাণীকে অকারণে হত্যা বা নির্যাতন না করা, আহত প্রাণী দেখলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, বন্যপ্রাণী ধরে পোষা থেকে বিরত থাকা এবং প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস না করার বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে।
তাদের পরামর্শ, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং দায়িত্ববোধ শেখানো জরুরি। কারণ প্রকৃতিকে ভালোবাসার শিক্ষা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই শুরু হয়।
বিশ্ব প্রাণী দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের উপলক্ষ নয়, বরং মানুষের সঙ্গে প্রাণীর সম্পর্ক নতুন করে ভাবারও দিন। পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়—এই গ্রহে মানুষের পাশাপাশি অসংখ্য প্রাণীরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রাণীদের নিরাপদ অস্তিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করে তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি করাই হোক বিশ্ব প্রাণী দিবসের অঙ্গীকার।
পড়ুন: মাঝ আকাশে রেডিও-রাডার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাইট নিখোঁজ
আর/


