বিজ্ঞাপন

সিএনজি চালক বাবার ঘামের-শ্রমে ছেলে এখন ৪৬ ও ৪৭তম বিসিএসের ক্যাডার

অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম আর শিক্ষার প্রতি গভীর নিষ্ঠা—দারিদ্র্যকে জয় করে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার কহেলা গ্রামের মোহাম্মদ সাগর খান। ৪৬তম বিসিএসে তথ্য ক্যাডার এবং ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। সিএনজি চালিয়ে পরিবারের পাঁচ সদস্যের সংসার চালিয়ে তিন ছেলে ও এক মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন বাবা আকবর খান। সেই পরিবারের বড় ছেলে সাগর আজ বিসিএস ক্যাডার। তার এমন সাফল্যে গর্বিত পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী।

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ সাগর খান মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়নের কহেলা গ্রামের মো. আকবর খানের ছেলে। সীমিত আয়ের সংসারে সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াই ছিল বাবা আকবর খানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় সন্তানদের ভালো পোশাক কিনে দিতে পারেননি, পছন্দের খাবারও জোটেনি। তবুও অভাবের কাছে হার মানেননি তিনি। নিজের কষ্টকে সঙ্গী করে তিন ছেলে ও এক মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।

বাবার সেই ত্যাগ ও কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যান সাগর। কহেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে রাজাপুর-কহেলা বাহরাম মল্লিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

সাগরের সাফল্যের পথও ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে এসএসসি পর্যন্ত কুপি ও হারিকেনের আলোয় পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে। কখনো কেরোসিনের অভাবে দিনের আলোতেই পড়াশোনা শেষ করেছেন। নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতে করেছেন টিউশনি। তবে দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা তার স্বপ্নকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।

২০২৫ সালের ২ জুলাই ওয়ান ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি পান সাগর। চাকরিতে যোগদানের মাত্র নয় দিনের মাথায় মারা যান তার মা সেলিনা বেগম। মায়ের মৃত্যুর শোক বুকে নিয়েই ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। পরে তথ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

তবে সাগরের মায়ের স্বপ্ন ছিল, ছেলে একদিন প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে দেশের মানুষের সেবা করবেন। মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণে হাল ছাড়েননি সাগর। অবশেষে ৪৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে পূরণ করেন মায়ের সেই স্বপ্ন।

সাগরের বাবা আকবর খান বলেন, সন্তানদের মানুষ করতে জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন তিনি। অনেক সময় ছেলেমেয়েদের ভালো পোশাক দিতে পারেননি, ভালো খাবারও খাওয়াতে পারেননি। তবুও তাদের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি। আজ বড় ছেলে বিসিএস ক্যাডার হওয়ায় তার সব কষ্ট সার্থক হয়েছে। ছেলে যেন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের মানুষের সেবা করে—এটাই তার প্রত্যাশা।

নিজের সাফল্যের অনুভূতি জানিয়ে মোহাম্মদ সাগর খান বলেন, দারিদ্র্য কখনো মানুষকে থামিয়ে রাখতে পারে না। প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। ছোটবেলা থেকেই তিনি শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মানুষকে বড় হতে হলে এবং সমাজের জন্য কিছু করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।

সাগর আরও বলেন, ছোটবেলায় তার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। কারণ তিনি দেখেছেন, অনেক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হন। নানা কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলেও এখন প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে মানুষের সেবা করতে চান তিনি। এ জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন সাগর।

সাগরের সাফল্যের খবরে আনন্দিত কহেলা গ্রামের মানুষ। এলাকাবাসী বলছেন, সিএনজি চালিয়ে সংসারের অভাব-অনটনের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন আকবর খান। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়েছেন তিনি। তার সেই ত্যাগের ফলেই আজ বড় ছেলে সাগর দুই বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। সাগরের এই অর্জন শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো কহেলা গ্রামের গর্ব।

অভাবের সংসারে বাবার ঘাম ঝরানো পরিশ্রম, মায়ের স্বপ্ন আর নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে পুঁজি করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন মোহাম্মদ সাগর খান। তার জীবনগল্প প্রমাণ করে—জীবনে বড় হওয়ার জন্য দামি পোশাক বা বিলাসী জীবন নয়, প্রয়োজন স্বপ্ন, শিক্ষা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি।

পড়ুন:কুষ্টিয়া ভেড়ামারায় সাবেক পৌর মেয়র আনোয়ারুল কবির টুটুলের উপর সন্ত্রাসী হামলা

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন