বিজ্ঞাপন

দুই হাত নেই, তবুও ডানা মেলে স্বপ্ন: সরকারি চাকরির আশা তাওহীদের

“হাত নেই বলে থমকে দাঁড়ায়নি পথ,
পা দিয়ে লিখে বুনেছেন শত শপথ।
চোখ মেলে চেয়ে আকাশের নীল পানে,
জীবন জয়ের গান গায় অদম্য প্রাণে।”
-আব্দুল লতিফ।।

ভোরের আলো ফুটলেই গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার পাশে থমকে দাঁড়ায় নিয়তি। জন্ম থেকেই যার দুটি হাত নেই, তার পৃথিবীর ক্যানভাসে ছবি আঁকার কথা ছিল না। কথা ছিল না হাজারো প্রতিকূলতার দেয়াল টপকে বিজয়ের নিশান ওড়াবার। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা আর দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর পরিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক অনন্য ইতিহাস লিখে চলেছেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ৭নং দিগড় ইউনিয়নের গারট্র উত্তর পাড়া (খুশিপাড়া) গ্রামের সন্তান মো. তাওহীদ ইসলাম।

পিতা মো. ফজলুল হক এবং মাতা রত্না খাতুনের কোল আলো করে আসা তাওহীদুলের জীবনটা আর দশটা শিশুর মতো সহজ ছিল না। শৈশবে সমবয়সীরা যখন হাত বাড়িয়ে জীবনের রঙ কুড়াতো, তখন অবুঝ তাওহীদুল নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে থাকতেন নিজের খালি দুটি কাঁধের দিকে। কিন্তু তিনি হার মানেননি; প্রকৃতির কাছে হার না মেনে পা দুটোকেই বানিয়ে নিয়েছেন হাত, আর আঙুলগুলোকে করেছেন স্বপ্নের কলম।

“অশ্রু জমেছে চোখের কোণে অজস্র নিশিরাতে,
তবু কলম থেমে থাকেনি, পায়ের ওই শক্ত মুঠোতে।
ব্যথার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে যিনি জিতেন দিনপ্রতিদিন,
তাঁর এই লড়াইয়ের কাছে ইতিহাস নিজেই ঋণ।”

পা দিয়ে প্রতিটি অক্ষর লেখার পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত এক কষ্টের গল্প। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আঙুলের ভাঁজে কলম চেপে ধরে পড়াশোনা করতে গিয়ে আঙুলে ক্ষত তৈরি হয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে ক্ষতবিক্ষত করতে পারেনি কোনো যাতনা। সেই কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে এইচএসসিতে জিপিএ ৪.৩৮ অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ঐতিহাসিক করটিয়া সা’দত কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

মায়ের ভেজা চোখ আর বাবার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে তাওহীদুল এখন কেবল নিজের আলোয় আলোকিত হচ্ছেন না, পুরো সমাজের আঁধার ঘোচাচ্ছেন। তবে তাঁর ভেতরের লুকানো আকুতিটা ভীষণ ভারী, বড় করুণ।

গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে তাওহীদুল বলেন—”আমার দুটি হাত নেই, বেঁচে থাকার তাগিদে আমি পা দিয়েই সব লিখি। আমার খুব বেশি চাওয়া নেই এই পৃথিবীর কাছে; আমি কেবল নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে চাই। কষ্ট করে পড়াশোনাটা শেষ করে যদি একটি সরকারি চাকরি পাই, তবে আমার ভাঙা সংসারের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারব। আল্লাহ যদি সেই সুযোগটা দেন, তবে এই জীবন সার্থক হবে।”

“হাত নেই বলে কে বলে গো তিনি একা?
তাঁর বিশ্বাসের ক্যানভাসে তো স্বর্গের আলো আঁকা।
রাষ্ট্র কি দেবে না বাড়িয়ে একটু সহানুভূতির হাত?
মুছে কি যাবে না তাঁর জীবনের এই ঘোর অমাবস্যা রাত?”

উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথটা তাওহীদের জন্য মোটেও মসৃণ নয়। অভাবের কষাঘাত আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তা প্রতিদিন রাতে তাঁর দু চোখের ঘুম কেড়ে নেয়। পা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখে যখন শরীর আর সায় দেয় না, তখনও তিনি স্বপ্ন দেখেন—একদিন তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন কান্না ও রক্তঘাম সফল হবে।

তাওহীদ ইসলামের এই নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম আমাদের হৃদয়কে নাড়িয়ে দেয়, চোখের কোণে জন্ম দেয় উষ্ণ অশ্রুর। তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের শারীরিক অক্ষমতা কখনোই আত্মাকে বন্দি রাখতে পারে না। এখন শুধুই অপেক্ষা—একটি সরকারি চাকরির সুযোগ, একটুখানি সহানুভূতি আর রাষ্ট্র ও সমাজের ভালোবাসার হাত, যা এই অদম্য বীরের জীবনকে পূর্ণতা দেবে।

বাবা মো. ফজলুল হক বলেন,”ছেলেটার যখন জন্ম হলো, হাত দুটো না দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। ভেবেছিলাম ও হয়তো সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে। কিন্তু তাওহীদুল আমাদের ভুল প্রমাণ করেছে। পা দিয়ে লিখে যখন ভালো ফল করে, গর্বে বুকটা ভরে যায়। তবে আমার তো সামর্থ্য নেই, বয়সও হচ্ছে—ওকে একটা সরকারি চাকরি দিলে আমরা অন্তত শান্তিতে মরতে পারতাম।”

মা মোছা. রত্না খাতুন কান্না জড়ানো কণ্ঠ বলেন”ছোটবেলা থেকে ছেলেটার কষ্ট চোখের সামনে দেখেছি। অন্য বাচ্চারা যখন খেলত, ও তখন এক মনে পা দিয়ে অক্ষর লেখা প্র্যাকটিস করত। ব্যথায় পা ফুলে যেত, রাতে ঘুমাতে পারত না, আমি লুকিয়ে কাঁদতাম। আমার তাওহীদ কারো কাছে দয়া চায় না, ও নিজের যোগ্যতায় বাঁচতে চায়। সরকার যেন আমার এই অবুঝ ছেলেটার দিকে একটু নজর দেয়।”

এলাকাবাসী বলেন,”তাওহীদ শুধু তার বাবা-মায়ের নয়, আমাদের পুরো গ্রামের গর্ব। দুই হাত না থাকার কষ্টকে হার মানিয়ে ও যেভাবে অনার্সে পড়ছে, তা আমাদের চোখের সামনে এক অলৌকিক ঘটনা। ওর মতো মেধাবী ও সংগ্রামী ছেলেকে যদি একটি সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা শুধু ওর একার নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক বড় অনুপ্রেরণা হবে।”

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : ধনী গরীব সকলের জন্য একই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন