দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন শেষ করার ঘোষণা করল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। এর আগে ক্রমশ বাড়তে থাকা আন্দোলনের চাপের মুখে শনিবার দুপুরে পদত্যাগ করেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন তার পদত্যাগ একদিকে যেমন ‘জেন-জি’র বিজয়, তেমনই নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কাছে তা এক বড় ধাক্কা।
মি. প্রধান পদত্যাগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরেও তখনও পর্যন্ত দুটি অমিমাংসিত দাবিতে অনড় ছিল সিজেপি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকে বসেন সরকারের দুই শীর্ষ মন্ত্রী এবং সিজেপির দুই প্রতিনিধি।
দাবিগুলো সরকার মেনে নেওয়ার পরেই আন্দোলন শেষ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তারা।
সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’ এর প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তার জেরে অন্তত ২০ জন পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রতিবাদ দিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এক মাসেরও বেশি আগে, তার অন্তিম পর্যায়ে, শনিবার দুপুর থেকে ঘটনাক্রম নাটকীয় মোড় নেয়।
শুক্রবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশের যুব সম্প্রদায়ের উদ্দেশে যে বক্তব্য রাখেন, তখনও কেউ আন্দাজ করতে পারেননি কী ঘটতে চলেছে পরের দিন।
অন্যদিকে, সকাল থেকেই যন্তর মন্তরে সুরক্ষা ব্যবস্থা আঁটোসাঁটো করা হয়েছিল। উপস্থিত অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন সেখানে কী হতে চলেছে।
এর মাঝেই ‘ব্রেকিং নিউজ’ আসে যে পদত্যাগ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী।
মি. প্রধানের ইস্তফার পরই যন্তর মন্তরে আন্দোলনরতদের মধ্যে ব্যাপক উল্লাস দেখা দেয়।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ধর্না মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেন, “প্রথমে কী বলেছিল ওরা, যে এই সরকারের আমলে পদত্যাগ হয় না। কিন্তু শেষপর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। আসলে দুনিয়া ঝুঁকতে বাধ্য হয়, (তার জন্য) ঝোঁকানোর মতো লোক দরকার।”
এর আগেও বেশ কয়েকটি ব্যাপক আন্দোলনের মুখে পড়তে হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে, তবে এবারই প্রথম আন্দোলনের চাপে কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হলো।
যে সিজেপির নেতৃত্বে এই আন্দোলনের সূচনা এবং দেশজুড়ে তার ক্রমবিস্তার – সেই প্ল্যাটফর্মের শুরুটা হয়েছিল একটা ‘অনলাইন স্যাটায়ারের’ হাত ধরে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এক মামলায় উল্লেখ করেছিলেন, কিছু ‘পরজীবী’ সিস্টেমকে আক্রমণ করছে।
তিনি বলেছিলেন, “ককরোচের মতো কিছু তরুণ রয়েছে, যারা কোনো চাকরি পায় না এবং পেশাতেও তাদের কোনো জায়গা নেই। তাদের মধ্যে কেউ গণমাধ্যমকর্মী হয়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ার, কেউ আরটিআই কর্মী, কেউ অন্য কর্মী, এবং তারা সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।”
তিনি এই বিষয়ে বিশদে ব্যাখ্যা দেওয়ার আগেই কিছুটা শ্লেষাত্মক ব্যঙ্গের আকারে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
ব্যঙ্গ করেই এর শুরুটা করেছিলেন অভিজিৎ দীপকে।
নিজেকে তিনি প্রথম তুলে ধরেন, ‘আমিও আরশোলা’ বলে। সেই পোস্ট ব্যাপক ভাইরাল হয়ে যায় এবং কয়েকদিনের মধ্যেই গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এক ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন দল।
দ্রুত তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় বিজেপির অনলাইন ফলোয়ারের সংখ্যা।
তখনো কেউ ভাবতে পারেনি এর ভবিষ্যৎ কী বা রূপরেখাই বা কী হবে। অভিজিৎ দীপকে নিজেও সংবাদ মাধ্যমের কাছে বহুবার তা স্বীকার করেছেন।
মাস খানেক আগে দিল্লিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনের সময়ে সামনে আসেন এর কয়েকজন সদস্য।
তারপর শিক্ষা ব্যবস্থা, মূলত সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা, যাতে ২২ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং যে পড়ুয়ারা আত্মহত্যা করেছেন – সমস্ত ঘটনার জন্য সরকারের জবাবদিহিতা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং সর্বোপরি মি প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয় সিজেপি।
জুন মাসের গোড়ার দিকে দিল্লির যন্তর মন্তরে ধর্না শুরু করেন অভিজিৎ দীপকে।
জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে সেখানে একটু করে সেখানে জমায়েত বাড়তে থাকে যা ক্রমে ব্যাপক আকারে বেড়ে যায়।
জুন মাসের শেষের দিকে ওই মঞ্চে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশন শুরু করেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ কর্মী সোনাম ওয়াংচুক।
যন্তর মন্তরে বিভিন্ন সময়ে আপ, কংগ্রেস-সহ বিরোধী নেতাদের দেখা যায়।
মি. ওয়াংচুকের অনশনের ২০ দিনের মাথায় জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। এরপর আন্দোলনের আঁচ আরো বাড়তে থাকে।
ডাক দেওয়া হয় ২০শে জুলাই সংসদ অভিযানের।
সেদিনের জনসমাবেশে ব্যাপক লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোঁড়া, নারীদের প্রতি অসম্মানসহ একাধিক অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।
সরকারকে কড়া সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।
এরই মাঝে একবার সরকারের সঙ্গে বৈঠক হয় সিজেপির সেখানে তারা নিজেদের দাবিতে অনড় থাকার কথা জানিয়ে দেয়।
সিজেপি যেমন দিল্লিতে জমায়েত করছিলো, সেই আন্দোলনের সমর্থনে নিজেদের ‘জেন-জি’ বলে দাবি করা হাজার হাজার মানুষ দেশের বিভিন্ন শহরে পথে নামতে থাকেন। কলকাতা, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর, পাটনা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা দেয়।
শুক্রবারও সিজেপির ডাকে বিভিন্ন রাজ্যে রাস্তায় নামেন ছাত্র, যুব ছাড়াও রাস্তায় নামেন বহু মানুষ।
অন্যদিকে নানা সামাজিক মাধ্যমেও চলতে থাকে বাগ-বিতণ্ডা। ‘জেন-জি’ রা যেমন কটাক্ষ করতে থাকেন কেন্দ্রীয় সরকারকে, অন্যদিকে বিজেপি-পন্থি সামাজিক মাধ্যমে হ্যান্ডেলগুলো থেকেও এই আন্দোলনকারীদের কখনও ‘চীনের দালাল’, ‘দেশ-বিরোধী’, ‘ডিপ স্টেটের চক্রান্ত’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করা হতে থাকে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও নানান কর্মসূচি করতে থাকে। এরফলে অনেকেই মনে করেন সরকারের উপর চাপ ক্রমশ বাড়ছিল।
তবে আন্দোলনের চাপে যে নরেন্দ্র মোদীর সরকার এই প্রথমবার পড়ল, তা নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সিএএ, এনআরসি বিরুদ্ধে শাহীনবাগের প্রতিবাদ, বিজেপির ব্রিজভূষণ সিংয়ের বিরুদ্ধে নারী কুস্তিগীরদের যৌন হেনস্তার অভিযোগে দিল্লিতে ভারতীয় কুস্তিগিরদের অন্দোলন বা পাঞ্জাব-হরিয়ানা-উত্তর প্রদেশের হাজার হাজার কৃষকের দিল্লি ঘেরাও করে রাখা মাসের পর মাস – এরকম একাধিক প্রতিবাদ কর্মসূচির মোকাবিলা করতে হয়েছে বিজেপিকে।
তাই নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দাবিতে ক্রমশ দেশজুড়ে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে সে বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন অনেকেই।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
পড়ুন :আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান


