দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে চলতি বছরের শেষে ২০ শতাংশ এবং আগামী বছরের শেষে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে ২১ দফা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ধাপে নমনীয় নীতিতে ঋণ আদায়ে জোর দেওয়া হবে। ‘এক্সিট পলিসি’র আওতায় অন্তত মূল ঋণ পরিশোধ করলে সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হবে। এ সুবিধা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। তবে এরপর থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নতুন করে ঋণ পুনঃতপশিলের জন্য বিশেষ কোনো নীতিমালা আনা হবে না।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ কমিয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) ও মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকগুলোর পরিচালকদের নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে। ওই সময়ের মধ্যে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালকরা মালিকানা হারাবেন। একই সঙ্গে পরবর্তী পাঁচ বছর কোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সুযোগও থাকবে না। প্রয়োজনে ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের আওতায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বিক্রি, একীভূতকরণ বা অবসায়নের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আগামী বছর থেকে দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুন বিধানে ছয় মাসের মধ্যে ঋণসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি যেসব খেলাপি গ্রাহক নমনীয় নীতির পরও ঋণ পরিশোধ করবেন না, তাদের নাম ও ছবিসহ তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিমানবন্দর, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখার সামনে এসব তালিকা প্রদর্শনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশেষ সুবিধায় ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল করা হয়। গত বছর আরও ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল হলেও এর বড় অংশ এখনও অনাদায়ী রয়েছে। গত বছর শেষে পুনঃতপশিলের পর অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। এছাড়া উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, খেলাপি ঋণ কমানো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। শুরুতে ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে সুযোগ গ্রহণ না করলে পরবর্তীতে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
তৃতীয় ধাপে গঠিত হবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি), যা খেলাপি ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তি নগদ অর্থে কিনবে। তবে সম্পত্তি বিক্রি করলেও ঋণগ্রহীতা সম্পূর্ণ দায়মুক্ত হবেন না। সম্পদের বিক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থের দায় তার ওপরই থাকবে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী ঋণ টেনে নেওয়ার চেয়ে কিছু ছাড় দিয়ে হলেও দ্রুত আদায় করা বেশি কার্যকর হতে পারে। তবে এই সুবিধার যেন কোনো অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, বন্ধকি সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ নিশ্চিত না হলে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনায় আরও রয়েছে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা (আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম), ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনা, খেলাপি ঋণ আদায়ে কর্মকর্তাদের বিশেষ ভাতা এবং বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে বন্ড ইস্যুর মতো পদক্ষেপ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনার আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইমি/


