বিজ্ঞাপন

নজরুলকে বাদ দিলে বাংলাদেশও বাংলাদেশ থাকবে না: কবি আবদুল হাই শিকদার

দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক, কবি ও নজরুল গবেষক আবদুল হাই শিকদার বলেন, কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া গেলে বাংলাদেশও আর বাংলাদেশ থাকবে না। দুধ থেকে যেমন সাদা রং আলাদা করা যায় না, তেমনি বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্কও অবিচ্ছেদ্য। স্বাধীনতা, সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, নারী-মুক্তি কিংবা জাতীয় চেতনা—প্রতিটি প্রশ্নেই আমাদের শেষ পর্যন্ত নজরুলের কাছেই ফিরে যেতে হয়।

বিজ্ঞাপন

নজরুলবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) সকাল ১১টায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে ইন্সটিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ আয়োজিত ‘একক বক্তৃতা ও গবেষণা প্রকল্পের অগ্রগতি’ শীর্ষক সেমিনারের প্রথম অধিবেশনে একক বক্তা হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন।

বক্তৃতার শুরুতে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নজরুলকে নিয়ে যে গবেষণা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ কিংবদন্তি, লোককাহিনি ও যাচাই-বাছাইহীন তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নজরুলের প্রকৃত জীবন, ব্যক্তিত্ব ও চিন্তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালেই থেকে গেছে। ইতিহাস ও কিংবদন্তির পার্থক্য অনুধাবন করে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে নতুন করে নজরুলকে মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।

এ সময় তিনি ত্রিশালে নজরুলের ছাত্রজীবনের নানা ঘটনা তুলে ধরে বলেন, দারোগা কাজী রফিজুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের অবদান ছাড়া নজরুলের শিক্ষাজীবনের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। রফিজুল্লাহর সহধর্মিণী বেগম শামসুন্নাহার নজরুলের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর পড়াশোনার দায়িত্ব গ্রহণে স্বামীকে উদ্বুদ্ধ করেন। পরে দারোগা রফিজুল্লাহ নজরুলের থাকা-খাওয়া, লেখাপড়া এবং তাঁর মায়ের কাছে নিয়মিত অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থাও করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অবদান স্মরণে কোনো স্থাপনার নামকরণ করারও আহ্বান জানান তিনি।

নজরুলের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক বিকাশের পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন এবং উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের উত্তাল সময়েই নজরুলের চেতনার বিকাশ ঘটে। সেনাবাহিনী থেকে ফিরে ১৯২০ সালে কলকাতায় এসে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠে পরিণত হন। ১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে জনমানুষের কবিতে পরিণত করে।

তিনি বলেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও অনন্য সৃষ্টি।

বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে নজরুলকে মূল্যায়ন করে তিনি বলেন, জর্জ বার্নার্ড, টি. এস. এলিয়ট, ভার্জিনিয়া উলফ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, রবার্ট ফ্রস্ট, হারমান হেসে, পাবলো নেরুদা, নাজিম হিকমতসহ বহু বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই নির্দিষ্ট ধারার সাহিত্যিক হলেও নজরুল ছিলেন বহুমাত্রিক স্রষ্টা। কবিতা, গান, গজল, নাটক, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা ও সুরসৃষ্টিতে তিনি একযোগে অবদান রেখেছেন।

জাতীয় কবির স্বীকৃতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১৯২৯ সালে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, এস. ওয়াজেদ আলী, মুহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও আবুল কালাম শামসুদ্দীনের উপস্থিতিতে জাতীয় সংবর্ধনার মাধ্যমে নজরুলকে বাংলার জাতীয় কবি হিসেবে সম্মানিত করা হয়। তাই তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়ার কৃতিত্ব পরবর্তী সময়ের নয়, বরং তাঁর সমকালীন মনীষীদের।

বক্তৃতায় তিনি বলেন, নজরুলের সাহিত্য কেবল বিদ্রোহের সাহিত্য নয়; এটি মানবমুক্তির সাহিত্য। মানবতা, সাম্য, স্বাধীনতা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট। ‘গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই’, ‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ কিংবা ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন’—এসব উচ্চারণ আজও বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তি।

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার প্রসঙ্গেও তিনি নজরুলকে পথিকৃৎ আখ্যা দিয়ে বলেন, ১৯২২ সালে ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে গণমুখী ও প্রতিবাদী সাংবাদিকতার সূচনা করেন। ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান নিয়ে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলার কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। গণমানুষের পক্ষে দাঁড়ানো সাংবাদিকতার যে ধারা আজও অনুসরণীয়, তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাজী নজরুল ইসলাম।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আবদুল হাই শিকদার বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে শুধু বাঙালি নয়, গারো, চাকমা, সাঁওতালসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষও অংশ নিয়েছিল। এই বহুত্ববাদী জাতীয় চেতনা এবং সকল মানুষের মর্যাদার দর্শনের সঙ্গে নজরুলের মানবতাবাদী চিন্তার গভীর মিল রয়েছে।

বক্তৃতার শেষাংশে তিনি বলেন, “যদি মানবতা, স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা, নারী-অধিকার, গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে আমাদের বারবার নজরুলের কাছেই ফিরে যেতে হবে। কারণ কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি নন; তিনি বাংলাদেশের জাতীয় চেতনা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং মুক্তির দর্শনের সবচেয়ে উজ্জ্বল বাতিঘর।”

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড.এমদাদুল হুদা ডিন কলা অনুষদে অধ্যাপক ড. এ এইচ এম কামাল ডিন বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ অধ্যাপক শাখাওয়াত হোসেন সরকার ডিন ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, অধ্যাপক ড. বখতিয়ার উদ্দিন ডিন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এমদাদুর রাশেদ ডিন চারুকলা অনুষদ, মোহাম্মদ ইরফান আজিজ ডিন আইন অনুষদ প্রমুখ । স্বাগত বক্তব্য রাখেন কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব স্টাডিস এর অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল আনাম। অনুষ্ঠানের শুরুতেই অতিথিবৃন্দদেরকে উত্তরীয় ও কবি নজরুলের সম্মাননা প্রদান করা হয়।

পড়ুন:জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে মাদকদ্রব্যসহ ১৬জন গ্রেফতার

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন